EMMTEX SLN Textile Industry Advertisement Banner

এনায়েত হোসেনের বেড়ে ওঠা মাদারীপুরে। ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগৎ তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করত। স্কুলজীবনে তিনি যেমন খেলাধুলায় সক্রিয় ছিলেন, তেমনি সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন।

১৯৮৪ সালে তিনি মাদারীপুর ইউনাইটেড ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি সম্পন্ন করেন। তবে তাঁর ছাত্রজীবনের পরিচয় কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি তৎকালীন জুনিয়র রেড ক্রসের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও ক্যাম্পে অংশ নিতেন নিয়মিত।

১৯৮২ সালে তিনি দ্বিতীয় বাংলাদেশ ও চতুর্থ এশিয়া-প্যাসিফিক স্কাউট জাম্বুরিতে অংশগ্রহণ করেন। অর্জন করেন রাষ্ট্রপতি পদক, যা তাঁর কৈশোরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে আজও স্মরণীয়।

এর পরের বছরেই নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিশ্ব রেড ক্রস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় রচনা প্রতিযোগিতায় সারা দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন। রেড ক্রস ও প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে লেখা সেই রচনাই তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়।স্কুলের মাঠেও ছিল তাঁর সমান উপস্থিতি। ফুটবল, ভলিবল, হকি কিংবা ব্যাডমিন্টন—বিভিন্ন খেলাধুলায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন তিনি। নেতৃত্ব, দলগত কাজ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের যে শিক্ষা পরবর্তী জীবনে তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই সময়েই।

কলেজ ও টেক্সটাইল শিক্ষাজীবন:

১৯৮৬ সালে মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করার পর তিনি ভর্তি হন তৎকালীন কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজিতে, যা বর্তমানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) নামে পরিচিত।

১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর কলেজ জীবন ছিল একদিকে একাডেমিক শিক্ষার, অন্যদিকে সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের এক সমৃদ্ধ অধ্যায়।তিনি সরকারী নাজিমউদ্দিন কলেজের বিজ্ঞান ক্লাবের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একইসঙ্গে সন্ধানী ডোনার ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থেকে রক্তদান ও চক্ষুদান কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন। রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রমেও ছিলেন সক্রিয়।এই সময় তিনি জাতীয় পর্যায়ের সাতটি রেড ক্রিসেন্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেন। প্রথম কয়েকটিতে অংশগ্রহণকারী হিসেবে এবং পরবর্তীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একটি জাতীয় ক্যাম্পে দেয়ালিকা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন তাঁর সৃজনশীলতারও স্বাক্ষর বহন করে।

বক্তৃতা, বিতর্ক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তিনি টেক্সটাইল কলেজের প্রতিনিধিদলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। উচ্চ মাধ‍্যমিকে পড়াকালীন সময়ে জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় একাধিকবার অংশ নিয়েছিলেন। উপস্থিত বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তিতেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়।

উত্তাল নব্বই এবং ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নব্বইয়ের দশক ছিল পরিবর্তনের সময়। সেই সময়ের ছাত্র আন্দোলন ও গণআন্দোলনের আবহ থেকে দূরে ছিলেন না এনায়েত হোসেনও।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। টেক্সটাইল কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

তাঁর মতে, সেই সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে সংগঠন পরিচালনা, মতভিন্নতার মধ্যেও কাজ করা এবং নেতৃত্বের বাস্তব চর্চা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।১৯৯৪ সালে টেক্সটাইল প্রকৌশলী হিসেবে স্নাতক সম্পন্ন করার মাধ্যমে তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

পেশাজীবনের বাস্তব পাঠ

স্নাতক সম্পন্ন করার পর কর্মজীবনের শুরু হয় ইউরো এশিয়াটিক বাংলাদেশ লিমিটেডে সেলস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। ইউরোপীয় টেক্সটাইল যন্ত্রপাতির বিপণনের সঙ্গে যুক্ত এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে তিনি শিল্পের বাণিজ্যিক দিক সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন।

তবে খুব দ্রুতই তিনি উপলব্ধি করেন যে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং কারখানার বাস্তব কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ বেশি। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি নারায়ণগঞ্জের নিটেক্স ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেডে প্রোডাকশন অফিসার হিসেবে যোগ দেন।

পরবর্তীতে গাজীপুরের আয়মন টেক্সটাইল অ্যান্ড হোসিয়ারি লিমিটেডে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ শিফট ডিউটি, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পকারখানার দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ তাঁকে একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৯৬ সালে, যখন তিনি নারায়ণগঞ্জের রেইনবো ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস লিমিটেডে যোগ দেন।সেখানে ধাপে ধাপে ম্যানেজার, এজিএম, ডিজিএম এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় সাত বছর জিএম হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে শিল্প ব্যবস্থাপনা, জনসম্পদ উন্নয়ন এবং উৎপাদন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গভীর দক্ষতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়।

চাকরি থেকে উদ্যোক্তা

দীর্ঘ করপোরেট অভিজ্ঞতার পর ২০০৩ সালে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব ছেড়ে নিজেই শিল্প উদ্যোক্তা হওয়ার পথে হাঁটেন।

২০০৪ সালে মাত্র চারটি নিটিং মেশিন দিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন যাত্রা। শুরুটা ছিল সীমিত পরিসরে ধীরে ধীরে সেই উদ্যোগই পরিণত হয় নিট এম্পায়ার লিমিটেডে।বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। নিটিং, গার্মেন্টস ও ফেব্রিক সাপ্লাই কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের রপ্তানিমুখী বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং শিল্পখাতের দীর্ঘ বাস্তব জ্ঞান তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে।

আইটিইটি ও পেশাজীবী সংগঠনে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা

টেক্সটাইল শিল্পের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন এনায়েত হোসেন।

২০০২ সালে আইটিইটির নির্বাহী সদস্য হিসেবে সংগঠনে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ২০০৬ সালে যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে মহাসচিব নির্বাচিত হন।মহাসচিব থাকাকালীন সময়ে তখনকার আইটিইটি এর সভাপতির নেতৃত্বে সকল সদস‍্যবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে ২০১০ সনে কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজিকে টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)-এ উন্নীকরনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর দায়িত্বকালে আইটিইটির প্রথম ওয়েবসাইট চালু করা হয়। একই সময়ে গড়ে তোলা হয় আইটিইটি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, যা বর্তমানে প্রকৌশলীদের কল্যাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ তহবিল হিসেবে কাজ করছে।

পাশাপাশি তিনি আইইবির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সেন্ট্রাল কাউন্সিল মেম্বার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরাম, মাদারীপুর জেলা সমিতি, মাদারীপুর চেম্বার এন্ড কমার্স ইন্ড্রাটিস, স্কুল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন।

আইটিইটি নির্বাচন ও ইশতেহার

দীর্ঘদিন নির্বাচনহীন থাকা আইটিইটি-কে গতিশীল করতে তিনি সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে তিনি নৈতিক অবস্থান থেকে নির্বাচনের পূর্বেই সেই পদ থেকে পদত্যাগ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ।

আগামী ২৬শে জুনের নির্বাচনে সভাপতি পদপ্রার্থী হিসেবে তাঁর রয়েছে এক বাস্তবসম্মত ইশতেহার। ইতোমধ্যে তিনি জানিয়েছেন যে তার নির্বাচনী ইশতেহারে শুধুমাত্র সেই বিষয়গুলোই রয়েছে যা মেয়াদকালে পূর্ণ করা সম্ভব। নির্বাচনী ইশতেহার খুব শীঘ্রই প্রকাশ করবেন বলে তিনি জানান।

তাঁর প্রধান স্বপ্নের একটি হলো ‘আইটিইটি ভবন’ নির্মাণ। ইতিমধ্যে রাজউকের কাছ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ১০ কাঠা জমির কিস্তি পরিশোধ ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ তাঁর হাত ধরেই ত্বরান্বিত হয়েছে । তাঁর পরিকল্পনা রয়েছে ২ বছরের মেয়াদে এই জমিতে অন্তত দুই-তিন তলা ভবন সম্পন্ন করা ।

ইঞ্জিনিয়ার এনায়েত হোসেন চান আইটিইটি-কে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে যেখানে:

১. সদস্যদের সুরক্ষা: কর্মক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের হয়রানি রোধে একজন স্থায়ী ‘আইন উপদেষ্টা’ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর ।

২. কল্যাণ তহবিল: ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সদস্যদের জন্য লাইফ ইন্স্যুরেন্স বা জীবন বিমার ব্যবস্থা করা ।

৩. দক্ষতা বৃদ্ধি: তরুণ প্রকৌশলীদের জন্য আধুনিক ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করে তাদের ইন্ডাস্ট্রি উপযোগী করে গড়ে তোলা ।

৪. জাতীয় প্রতিনিধিত্ব: বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ-র সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বস্ত্র খাতের নীতি নির্ধারণে আইটিইটি-র সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ।

About The Author

সম্পাদক
ইঞ্জি: আতিকুর রহমান আতিক
Email: Contact@textilemirrorbd.com