দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন ক্রমাগত কমে যাওয়ায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। নতুন সরবরাহ বাড়াতে দৃশ্যমান বড় কোনো সরকারি উদ্যোগ না থাকায়, ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের অর্থনীতিতে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়বে।

গ্যাসের এই তীব্র সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে, যার ফলে কাজ হারাতে পারেন অসংখ্য শ্রমিক ও কর্মচারী। শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকরাও গ্যাসের কম চাপের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, গ্যাসের চাপ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের সব শিল্পকারখানা ও সাধারণ গ্রাহকরা চরম বিপদে পড়বেন। বিষয়টি ইতিমধ্যেই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জানানো হয়েছে।

চাহিদা ও সরবরাহের বিশাল ঘাটতি

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। তবে এর বিপরীতে প্রতিদিন সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২৬৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এই সরবরাহের মধ্যেও ১০৩ কোটি ২৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস আসছে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে।

শুধু তিতাস গ্যাস কোম্পানির এলাকাতেই সাড়ে ৪ হাজারের বেশি শিল্প ও ক্যাপটিভ সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে এখনই গ্যাসের অভাবে শত শত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক ৭ কোটি ঘনফুট বাড়ানোর কারণে গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, টাঙ্গাইল, চন্দ্রা ও কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।

সংযোগের অপেক্ষায় হাজারো নতুন কারখানা

গ্যাস সংকটের কারণে নতুন শিল্পকারখানায় সংযোগ দেওয়াও বন্ধ রয়েছে। জ্বালানি বিভাগের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী: ৫৫০টি শিল্পকারখানা ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েও বছরের পর বছর ধরে গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।

আরও প্রায় ১,৩০০টি নতুন কারখানা

সংযোগের জন্য আবেদন করে রেখেছে। এই মোট ১,৮০০ নতুন গ্রাহককে সংযোগ দিতে হলে দৈনিক আরও অন্তত ৪০ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাসের প্রয়োজন।

দ্রুত কমছে দেশীয় খনির উৎপাদন

পেট্রোবাংলার সূত্র মতে, প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন প্রায় দেড় কোটি ঘনফুট করে কমে যাচ্ছে। অথচ এর বিপরীতে চাহিদা বাড়ছে কয়েক গুণ।

বর্তমানে আমদানি করা গ্যাসসহ দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হলেও, আগামী বছরের জুনে তা ২৬০ কোটি ৭০ লাখে এবং ২০২৮ সালে ২৫৭ কোটি ঘনফুটে নেমে আসবে। ওই সময়ে গ্যাসের চাহিদা দাঁড়াবে ৫০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ২০২৮ সালের শেষে দেশের ২২টি দেশীয় ক্ষেত্রের উৎপাদন বর্তমানের ১৬৫ কোটি ঘনফুট থেকে কমে মাত্র ৮৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসবে।

নেই বড় কোনো সরকারি উদ্যোগ

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৯ সালের মধ্যে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের চেষ্টা করছে সরকার, যা থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। তবে গত ৫ মাসেও এই টার্মিনাল নির্মাণের কাজ কোন কোম্পানি পাবে, তা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

ভোলা গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও পাইপলাইন নির্মাণ কবে শেষ হবে তা অনিশ্চিত। এছাড়া, গত ৪ বছরে ২০টিরও বেশি কূপ খনন করেও পেট্রোবাংলা দৈনিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ বাড়াতে পারেনি। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও, চুক্তি ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com