বিশ্ববাজারে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ইউরোপীয় খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতির কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পোশাক আমদানিতে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতেও। প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।
ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ইউরোতে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ কম।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপের বাজারে এই মন্দা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক পোশাক রফতানিকারকদের জন্যই উদ্বেগজনক বার্তা। তবে রফতানি আয়, ভলিউম ও ইউনিট মূল্যে একসঙ্গে বড় পতন হওয়ায় বাংলাদেশ তুলনামূলক বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমে দুই দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল তিন দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ইউরো।
অর্থাৎ, রফতানি আয় কমেছে প্রায় ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ।তিনি বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, চীন, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য রফতানিকারক দেশও ইইউ বাজারে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইইউতে পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। একই সঙ্গে গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ইউরোপের ক্রেতারা আগের তুলনায় কম পোশাক কিনছেন এবং কম দামে কিনছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপের ভোক্তারা এখনও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে পোশাকের মতো অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমে গেছে। অন্যদিকে, বড় ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত মজুত এড়াতে আগের তুলনায় কম অর্ডার দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রফতানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য কমেছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। এতে সামগ্রিক রফতানি আয়েও বড় ধাক্কা লেগেছে।
মাসভিত্তিক তথ্যেও দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের রফতানি মূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। একই সময়ে রফতানির পরিমাণ কমেছে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য কমেছে ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ।খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন কম দামে পোশাক কিনতে চাইছেন। কিন্তু দেশে জ্বালানি ব্যয়, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ডলার সংকট, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ বাড়ায় রফতানিকারকদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
ইইউ বাজারে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশও চাপে রয়েছে। চীনের রফতানি আয় কমেছে ৪ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। তবে দেশটি রফতানির পরিমাণ কিছুটা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, তুরস্কের রফতানিতে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে, যা প্রায় ২২ দশমিক ৯১ শতাংশ।ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও তারাও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এড়াতে পারেনি। তবে দেশটি ইউনিট মূল্য বাড়াতে সক্ষম হওয়ায় তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনও নিম্ন ও মধ্যমূল্যের পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমানোর চাপ বাড়লে দেশের রফতানিকারকদের লাভের পরিমাণ দ্রুত কমে যায়। এতে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।রফতানিকারকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকে বিনিয়োগ এবং নতুন বাজার খোঁজার দিকে গুরুত্ব বাড়ানো জরুরি। তা না হলে ২০২৬ সাল দেশের পোশাক শিল্পের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।


