EMMTEX SLN Textile Industry Advertisement Banner

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে পোশাকের আবির্ভাব যেমন প্রাচীন, তেমনি কাপড় তৈরির প্রযুক্তিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত হয়েছে। আজকের আধুনিক টেক্সটাইল শিল্পে কাপড় বা ফেব্রিক কেবল পোশাক তৈরির উপকরণ নয়; এটি গৃহসজ্জা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, শিল্পকারখানা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নানা খাতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু একটি সাধারণ কাপড় তৈরির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও জটিল একটি প্রক্রিয়া। তন্তু থেকে সুতা, তারপর সেই সুতার বিশেষ কাঠামো ও সংযোগের মাধ্যমে তৈরি হয় ফেব্রিক।

টেক্সটাইল প্রযুক্তিতে ফেব্রিক তৈরির তিনটি মৌলিক পদ্ধতি রয়েছে। এগুলো হলো বয়ন কাপড়, নিট কাপড় এবং নন-ওভেন কাপড়। প্রতিটি পদ্ধতির নিজস্ব গঠন, প্রযুক্তি ও ব্যবহার রয়েছে। এই তিন ধরনের কাঠামোই মূলত বিশ্বব্যাপী টেক্সটাইল উৎপাদনের ভিত্তি তৈরি করেছে।

ফেব্রিক বলতে মূলত এমন একটি নমনীয় সমতল উপাদানকে বোঝায় যা তন্তু বা সুতা থেকে তৈরি হয় এবং মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে তন্তু থেকে প্রথমে সুতা তৈরি করা হয়। এরপর সেই সুতা বিভিন্ন কাঠামোগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্ত করে কাপড় তৈরি করা হয়। কোথাও সুতাকে পরস্পরের সঙ্গে বুনে দেওয়া হয়, কোথাও লুপ তৈরি করে সংযুক্ত করা হয়, আবার কোথাও তন্তুগুলোকে রাসায়নিক বা যান্ত্রিকভাবে একত্র করে কাপড়ের মতো একটি স্তর তৈরি করা হয়। এই কাঠামোগত পার্থক্যই কাপড়ের শক্তি, নমনীয়তা, স্থায়িত্ব এবং আরাম নির্ধারণ করে।

ফেব্রিকের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রচলিত ধরন হলো বয়ন কাপড়। এই ধরনের কাপড় তৈরিতে দুটি আলাদা সুতার সেট ব্যবহার করা হয়, যেগুলোকে টেক্সটাইল প্রযুক্তিতে টানা ও পড়েন সুতা বলা হয়। টানা সুতা লম্বালম্বি থাকে এবং পড়েন সুতা আড়াআড়িভাবে সেই টানা সুতার সঙ্গে পরস্পর ক্রস করে একটি দৃঢ় কাঠামো তৈরি করে। এই পদ্ধতিতে তৈরি কাপড় সাধারণত লুম মেশিনে বোনা হয়। বয়ন কাপড়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর শক্ত কাঠামো এবং স্থায়িত্ব। সুতাগুলোর দৃঢ় বন্ধনের কারণে এই কাপড় সহজে প্রসারিত হয় না এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য থাকে।

বয়ন কাপড়ের গঠনের ভেতরেও আবার বিভিন্ন ধরনের বুনন পদ্ধতি রয়েছে। সবচেয়ে সাধারণ বুনন হলো প্লেইন উইভ, যেখানে প্রতিটি পড়েন সুতা টানা সুতার একবার উপর এবং একবার নিচ দিয়ে যায়। এই বুনন পদ্ধতিতে তৈরি কাপড় সাধারণত সমান ও স্থিতিশীল হয়। টুইল উইভ নামের আরেক ধরনের বুননে কাপড়ের ওপর তির্যক রেখা দেখা যায়।

ডেনিম কাপড়, যেটি দিয়ে জিন্স তৈরি করা হয়, এই ধরনের বুননের অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। আর সাটিন উইভ বুননে সুতার বিন্যাস এমনভাবে করা হয় যাতে কাপড়ের পৃষ্ঠ মসৃণ ও চকচকে হয়।

সিল্ক বা বিলাসবহুল পোশাক তৈরিতে এই ধরনের বুনন বেশি দেখা যায়। শক্তি ও স্থায়িত্বের কারণে বয়ন কাপড় সাধারণত শার্ট, প্যান্ট, শাড়ি, ডেনিম, বেডশিট এবং গৃহসজ্জার বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহৃত হয়।

বয়ন কাপড়ের পাশাপাশি টেক্সটাইল শিল্পে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হলো নিট কাপড়। এই কাপড় তৈরির পদ্ধতি বয়ন কাপড়ের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে সুতা দিয়ে ছোট ছোট লুপ তৈরি করা হয় এবং সেই লুপগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কাপড়ের কাঠামো গঠন করে। এই লুপ কাঠামোর কারণে নিট কাপড় সাধারণত বেশি নমনীয় ও প্রসারণশীল হয়। ফলে এই ধরনের কাপড় শরীরের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায় এবং ব্যবহারকারীর জন্য বেশি আরামদায়ক অনুভূতি তৈরি করে।

নিটিং প্রক্রিয়াও আবার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। ওয়েফট নিটিংয়ে সুতা আড়াআড়ি দিকে লুপ তৈরি করে, ফলে কাপড় সহজেই প্রসারিত হতে পারে। টি-শার্ট তৈরির জন্য ব্যবহৃত সিঙ্গেল জার্সি কাপড় সাধারণত এই পদ্ধতিতে তৈরি হয়। অন্যদিকে ওয়ার্প নিটিংয়ে বহু সুতা একসঙ্গে লম্বালম্বি দিকে লুপ তৈরি করে। এতে কাপড় তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল হয় এবং আকার ধরে রাখতে পারে। নিট কাপড়ের মধ্যে সিঙ্গেল জার্সি, ডাবল জার্সি, রিব নিট এবং ইন্টারলক নিটের মতো বিভিন্ন কাঠামো দেখা যায়। আধুনিক পোশাক শিল্পে বিশেষ করে স্পোর্টসওয়্যার, টি-শার্ট, সোয়েটার, মোজা এবং অন্তর্বাস তৈরিতে নিট কাপড় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

টেক্সটাইল প্রযুক্তির তুলনামূলক নতুন সংযোজন হলো নন-ওভেন কাপড়। এই ধরনের কাপড় তৈরিতে সুতা বোনা বা লুপ তৈরির প্রয়োজন হয় না। বরং তন্তুগুলোকে সরাসরি রাসায়নিক, তাপ অথবা যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একত্র করে একটি শিট বা স্তর তৈরি করা হয়। এই পদ্ধতিতে উৎপাদন তুলনামূলক দ্রুত এবং ব্যয়ও কম হয়। আধুনিক শিল্প ও চিকিৎসা খাতে নন-ওভেন কাপড়ের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নন-ওভেন কাপড় তৈরির বিভিন্ন প্রযুক্তি রয়েছে। স্পানবন্ড পদ্ধতিতে গলিত পলিমার থেকে সরাসরি তন্তু তৈরি করে তা দিয়ে কাপড়ের মতো একটি স্তর তৈরি করা হয়। মেল্টব্লাউন পদ্ধতিতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম তন্তু তৈরি করা হয়, যা সাধারণত ফিল্টার বা মেডিকেল পণ্যে ব্যবহৃত হয়। আবার নিডল-পাঞ্চ পদ্ধতিতে যান্ত্রিকভাবে তন্তুকে সূচের মাধ্যমে জড়িয়ে একটি শক্ত কাঠামো তৈরি করা হয়। দ্রুত উৎপাদন এবং নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত কাজে উপযোগী হওয়ায় নন-ওভেন কাপড় সার্জিক্যাল মাস্ক, মেডিকেল গাউন, ফিল্টার, ওয়াইপস, স্যানিটারি পণ্য এবং জিওটেক্সটাইলের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে।

টেক্সটাইল শিল্পে কাপড়ের গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কাপড়ের কাঠামোই নির্ধারণ করে সেটি কতটা শক্ত হবে, কতটা আরামদায়ক হবে এবং কোন কাজে ব্যবহার উপযোগী হবে। যেমন বয়ন কাপড় সাধারণত শক্ত ও টেকসই হওয়ায় ফরমাল পোশাক বা গৃহসজ্জার পণ্যে বেশি ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে নিট কাপড় নমনীয় ও আরামদায়ক হওয়ায় দৈনন্দিন পোশাক ও স্পোর্টসওয়্যারে বেশি দেখা যায়। আর নন-ওভেন কাপড় দ্রুত উৎপাদনযোগ্য হওয়ায় শিল্প ও চিকিৎসা খাতে এর ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী টেক্সটাইল শিল্পের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ফেব্রিক প্রযুক্তিতেও নতুন নতুন উদ্ভাবন ঘটছে। উন্নত তন্তু, স্মার্ট ফেব্রিক এবং পরিবেশবান্ধব টেক্সটাইল প্রযুক্তি ভবিষ্যতের শিল্পকে নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। তন্তু থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির এই দীর্ঘ যাত্রাই কাপড়কে শুধু দৈনন্দিন ব্যবহার্য বস্তু নয়, বরং আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত করেছে।

About The Author

সম্পাদক
ইঞ্জি: আতিকুর রহমান আতিক
Email: Contact@textilemirrorbd.com