বিদেশি বিনিয়োগের ওপর ভর করে পুনরায় উৎপাদনে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে বেক্সিমকো গ্রুপের বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো। নতুন এক লিজভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের উৎপাদন আবার শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান চার্টার এইচসিপি লিমিটেড এবং চীনা কোম্পানি বেস্টিং লিমিটেড যৌথভাবে ২৩ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৭০ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করবে। এই অর্থ দিয়ে পার্কটির ‘প্রিফিক্স ফ্যাশনস লিমিটেড’ নামের পোশাক কারখানাটিতে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা হবে।
বেক্সিমকোর টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল বিভাগের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক খালিদ শাহরিয়ার এবং বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপক রিভাইভাল গ্লোবালের সিইও হুদা মোহাম্মদ ফয়সাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রস্তাবিত এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে আগামী ১১ অক্টোবর বিনিয়োগ সহায়তা সংস্থা ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারি অনুমোদন মিললে ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে কারখানাটি চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক ধাপে এই কারখানায় মূলক রপ্তানিমুখী জ্যাকেট তৈরি করা হবে, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ। বাকি ১০ শতাংশ তৈরি হবে অন্যান্য পোশাক। কারখানাটি চালু হলে প্রথম দিকেই অন্তত আড়াই হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রিফিক্স ফ্যাশনস মূলত বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৬টি টেক্সটাইল ও পোশাক ইউনিটের একটি, যেখানে শুরু থেকেই চীনা কোম্পানি বেস্টিংয়ের যৌথ মালিকানা ছিল।
চুক্তি অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেক্সিমকোর সাথে পাঁচ বছরের জন্য একটি লিজ চুক্তি করবে। কারখানার রপ্তানি আয় থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি ঋণ ও বিনিয়োগ পরিশোধ করা হবে, যাতে কোনো আর্থিক জটিলতা তৈরি না হয়।বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, পুরোপুরি উৎপাদনে গেলে পরবর্তী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এখান থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
তবে কারখানা চালুর আগে পরিবেশ, শ্রম অধিকার এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সব শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পুরো ব্যবসায়িক মডেলটি বাস্তবায়নে ইনভেস্ট বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
প্রথম ধাপের এই প্রচেষ্টা সফল হলে ধাপে ধাপে বেক্সিমকোর বাকি ১৫টি বন্ধ কারখানাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে কাজ হারানো ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিকের পুনরায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমানে বেক্সিমকো বিশাল অঙ্কের ঋণসংকটে রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির মোট পাওনার পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যার মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ৩২টি কারখানার নামেই রয়েছে প্রায় ২৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। শুধু জনতা ব্যাংকের পাওনাই প্রায় ২৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারখানায় তৈরি হওয়া অস্থিরতা ও আর্থিক সংকটের কারণে শ্রমিকের বকেয়া পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় বেক্সিমকো। ফলে ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেক্সিমকোর ১৬টি ইউনিট বন্ধ ঘোষণা করে।
এর আগে শ্রমিকদের পাওনা মেটাতে সরকার ৫২৬ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তাও দিয়েছিল।সরকারি অনুমোদন ও সব প্রক্রিয়া সঠিকভাবে শেষ হলে এই উদ্যোগ শুধু একটি বন্ধ কারখানা সচল করাই নয়, বরং পোশাক খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।


