বছরের পর বছর লোকসান, ভর্তুকির বিপুল চাপ আর উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করেছে সরকার। অকার্যকর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় চালু করা ও সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধের লক্ষ্যে নেওয়া এই পদক্ষেপে একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে উঠছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ জনগণের লাভ কতটা নিশ্চিত হবে?

জাতীয়করণ থেকে বেসরকারিকরণের ইতিহাস

১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পাট, বস্ত্র, চিনি, রাসায়নিক ও প্রকৌশল খাতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে এক বিশাল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যবস্থা। সে সময় দেশের স্থায়ী শিল্পসম্পদের প্রায় ৯২ শতাংশই ছিল সরকারের অধীনে। উদ্দেশ্য ছিল কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ঠিক রাখা। তবে অতিরিক্ত জনবল, পুরোনো প্রযুক্তি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে সময়ের ব্যবধানে এসব প্রতিষ্ঠানে লোকসানের পাহাড় জমে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৭২ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে মালিকানা বদলালেই যে প্রতিষ্ঠান সফল হয়—ইতিহাস তা বলে না। ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বেসরকারিকরণ করা ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের ওপর চালানো এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, মাত্র ১৪টি চালু রাখতে পেরেছেন উদ্যোক্তারা, আর ২০টি প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এর বিপরীত উদাহরণও রয়েছে; যেমন চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স বেসরকারি খাতে যাওয়ার পর এর বিক্রি ও মুনাফা দুটোই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বিপুল আর্থিক চাপ ও নতুন বিনিয়োগের আশা

রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বর্তমান আর্থিক চাপ বেশ গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ অর্থবছরে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত লোকসান ছিল প্রায় ৪৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ভর্তুকি ও উন্নয়ন সহায়তা বাবদ সরকারকে দিতে হয়েছে আরও প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১.৭ শতাংশ।

এই বিপুল লোকসান কমাতে ২০২৬ সালে সরকার বন্ধ ও লোকসানি ৪৪টি কারখানা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে। এসব কারখানার সাথে যুক্ত রয়েছে ১০ হাজার একরেরও বেশি কৌশলগত শিল্পজমি। জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অবকাঠামোগত সুবিধা থাকায় দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী এতে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে। সম্প্রতি তিনটি পাটকল চালুর জন্য প্রায় ৬১৯ কোটি টাকার প্রস্তাবিত চুক্তি হয়েছে, যা থেকে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের আশা করা হচ্ছে।

জনগণের লাভ নিশ্চিতের উপায়

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কারখানাগুলোর মালিকানা বা ব্যবস্থাপনা বদলালেই সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ উদ্যোক্তাদের মূল নজর থাকে কারখানার জমি ও অবকাঠামোর ওপর। তাই সরকার কত দামে এসব সম্পদ ইজারা দিচ্ছে, কত রাজস্ব পাবে, কত মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং কারখানাগুলো আগের শিল্প হিসেবেই চালু থাকছে কি না—তা প্রকাশ্যে আনা জরুরি।

রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর আসল পরীক্ষা কেবল সেগুলো চালু করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থের সাশ্রয় করা, সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখা এবং জনগণের সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com