বাংলাদেশের রফতানি খাতে নতুন এক নীতিগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প শক্তিশালী করা এবং রফতানিতে প্রকৃত দেশীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে তারা।
ইতোমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ এর খসড়া প্রকাশ করেছে। খসড়ায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রফতানি খাতে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমাতে কড়াকড়িও আরোপ করা হয়েছে।সরকারের এই নীতিটি কার্যকর হলে রফতানিকারকদের অনেক ক্ষেত্রেই ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দেশীয় মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে তারা নগদ সহায়তা, শুল্ক সুবিধা কিংবা বন্ড সুবিধা হারাতে পারেন।বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের উদ্দেশ্যে ইতিবাচক হলেও বাস্তবতা বিবেচনায় না নিলে তৈরি পোশাকসহ কয়েকটি বড় রফতানি খাত চাপে পড়তে পারে। বিশেষ করে গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কাঁচামাল ঘাটতির বাস্তবতায় নতুন শর্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
কেন বাড়ানো হচ্ছে মূল্য সংযোজনের শর্ত
বর্তমানে বাংলাদেশের রফতানি শিল্পের বড় অংশই আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ওভেন পোশাক, সিনথেটিক ফাইবারভিত্তিক পণ্য, বিশেষায়িত নিটওয়্যার, জুতা ও চামড়াজাত শিল্পে আমদানি নির্ভরতা অনেক বেশি।
সরকার মনে করছে, এই নির্ভরতা কমানো না গেলে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ হবে না এবং রফতানি আয় থেকেও দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুফল তৈরি হবে না।
এছাড়া অর্থপাচার ঠেকানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যে রফতানি দেখিয়ে প্রকৃত আয় দেশে আনা হয় না। মূল্য সংযোজনের হার বাড়ালে দেশীয় উপকরণ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে এবং রফতানি আয়ের স্বচ্ছতাও বাড়বে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমানের মতে, “দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া সরকারের একটি বড় উদ্দেশ্য।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “অতিরিক্ত কঠোর শর্ত ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।”
কোন খাতে কত ভ্যালু এডিশন বাধ্যতামূলক হতে পারে
খসড়া নীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে তৈরি পোশাক খাতে। বর্তমানে শিশুদের পোশাক রফতানিতে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত রয়েছে। সেটি বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে তুলা ও ম্যান-মেইড ফাইবার দিয়ে তৈরি সব ধরনের নিট ও ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হতে পারে।
অন্তর্বাস ও সিনথেটিক ফাইবারভিত্তিক বিশেষায়িত পোশাকে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, নন-লেদার জুতায় ৩০ শতাংশ করে, জাহাজ রফতানিতে ৪০ এবং কাঠের ফার্নিচারে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বর্তমানে নিট, ওভেন ও শিশু পোশাক ছাড়া অন্য অনেক খাতে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে নতুন নীতি কার্যকর হলে প্রথমবারের মতো বেশ কয়েকটি রফতানি খাত কঠোর শর্তের মুখোমুখি হবে।
নিট ফেব্রিক আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ
খসড়া নীতির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশগুলোর একটি হলো—নিট ফেব্রিক আমদানির ওপর কার্যত নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব। সরকারের যুক্তি হচ্ছে, স্থানীয় টেক্সটাইল ও ডাইং শিল্পকে সুরক্ষা দিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো। কিন্তু রফতানিকারকরা বলছেন, বাস্তবতা এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
পোশাক শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশে এখনও অনেক ধরনের উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত ফেব্রিক উৎপাদন হয় না। এসব ফেব্রিক আমদানি বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “কিছু নিটওয়্যারে ৩০ শতাংশ ভ্যালু এডিশন সম্ভব হলেও ওভেন পোশাকে তা এখনও বাস্তবসম্মত নয়। দেশে উৎপাদিত হয় না—এমন বিশেষায়িত ফেব্রিক আমদানির সুযোগ অবশ্যই রাখতে হবে।”
নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার ভাষায়, “উচ্চমূল্যের নিটওয়্যার রফতানির জন্য এখনও আমদানিকৃত ফেব্রিকের ওপর নির্ভর করতে হয়। গ্যাস সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যে আমদানি বন্ধ করা হলে রফতানি বৈচিত্র্যকরণ বাধাগ্রস্ত হবে।”
ভিয়েতনামের উদাহরণ টানছেন বিশ্লেষকরা
রফতানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামে এ ধরনের কঠোর মূল্য সংযোজন বাধ্যবাধকতা নেই। সেখানে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো চীন থেকে কাঁচামাল এনে সামান্য মূল্য সংযোজন করে দ্রুত রফতানি করতে পারে। বাংলাদেশে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপ করা হলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। বিশেষ করে বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে অর্ডার কমে যাওয়া, মূল্যচাপ এবং ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ক্রেতারা আরও বেশি নমনীয়তা চাইছেন।
আমদানি স্বত্বেও আসছে বড় পরিবর্তন
খসড়া নীতিতে ‘ফ্রি-অফ-কস্ট’ সুবিধার আওতায় আমদানির সীমাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে তৈরি পোশাক, ওভেন ও শিশু পোশাক খাতে আগের বছরের রফতানি আয়ের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ রয়েছে। এটি অপরিবর্তিত থাকলেও ম্যান-মেইড ফাইবার ও সিনথেটিক পণ্যের ক্ষেত্রে সীমা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
এছাড়া জুতা ও চামড়াজাত পণ্যে ৬০ শতাংশ, জাহাজ শিল্পে রফতানি এলসির ৬০ শতাংশ, কাঠের ফার্নিচারে ৪০ শতাংশ, ফেব্রিক ফার্নিচারে ২০ শতাংশ এবং যন্ত্রাংশভিত্তিক ফার্নিচারে ১০ শতাংশ আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যবসা সহজীকরণে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও থাকছে
কঠোর শর্তের পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রস্তাবও রয়েছে। বর্তমানে এলসি ছাড়া বিক্রয় বা ক্রয় চুক্তির আওতায় সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ ডলার পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রয়েছে। নতুন নীতিতে এই সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া যন্ত্রপাতি আমদানিতে নির্দিষ্ট জাহাজীকরণ সময়সীমা তুলে দেওয়ার কথা বলছে সরকার।অনিবন্ধিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিজ ব্যবহারের জন্য আমদানি সীমা ১০ হাজার ডলার থেকে বাড়ানো; প্রবাসীদের পরিবারের জন্য শুল্কমুক্ত পণ্য পাঠানোর সীমা এক হাজার ডলার পর্যন্ত উন্নীত করা; পোশাক খাতে স্যাম্পল আমদানির সংখ্যা দ্বিগুণ করা এবং জুতা ও ট্যানারি খাতে নমুনা আমদানির সীমা বড় আকারে বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ
খসড়া নীতিতে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি আমদানির নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও সর্বোচ্চ ১০ বছর পুরোনো বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি দেশে তুলনামূলক কম দামে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।
ইসরায়েলি পণ্যে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা
নতুন খসড়ায় ইসরায়েল থেকে বা সেখানে উৎপাদিত কোনও পণ্য আমদানির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে ইসরায়েলের পতাকাবাহী জাহাজেও কোনও পণ্য আমদানি করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান নীতিতে বিষয়টি এতটা স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না।
সামনে কী হতে পারেবাণিজ্য মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার (২১ মে) স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে খসড়া নীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে। ওই বৈঠকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বেশ কয়েকটি প্রস্তাব সংশোধনের দাবি জানিয়েছে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা চাইছে— ওভেন পোশাকে ভ্যালু এডিশনের হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হোক; বিশেষায়িত ফেব্রিক আমদানির সুযোগ বজায় রাখা হোক এবং ডাইং ও টেক্সটাইল খাতে গ্যাস ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা হোক।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রফতানিতে দেশীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। তবে, সেই পরিবর্তন হতে হবে ধীরে, বাস্তবমুখী এবং শিল্প সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যথায় রফতানি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর উল্টো চাপ তৈরি হতে পারে।
লেখক: গোলাম মাওলা


