তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাত। লাইনে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পেরে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ইতোমধ্যে নতুন রফতানি আদেশ বা অর্ডার কমতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনগুলোতে রফতানি আয়ে বড় ধসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

হাজারের বেশি কারখানায় উৎপাদন প্রায় অচল

ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকার অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানায় উৎপাদন এখন নামমাত্র পর্যায়ে ঠেকেছে।দিন কিংবা রাত—কোনও সময়েই লাইনে পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। ফলে অনেক কারখানা দিনে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে বিকল্প উপায়ে কারখানা চালাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

আকাশপথে পণ্য পাঠাতে গুনতে হচ্ছে চড়া মাশুল

কারখানার সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হওয়ায় সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিদেশের বাজারের চুক্তি ও ক্রেতা ধরে রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত খরচ করে আকাশপথে (এয়ার ফ্রেইট) পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে কাপড়ের দাম বাড়ছে না। ফলে লোকসান গুনে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে দেনার দায়ে পড়ছেন উদ্যোক্তারা।

কমেছে ইউডি, অর্ডার স্থানান্তরের শঙ্কা

রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ সূচক হিসেবে বিবেচিত ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জুলাই মাসে নতুন রফতানি আদেশ প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। একাধিক রফতানিকারক জানিয়েছেন, অনেক বিদেশি ব্র্যান্ড ইতোমধ্যে নতুন অর্ডারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। ক্রেতারা এখন সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে—এমন প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। একবার অর্ডার অন্য দেশে চলে গেলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে বলে সতর্ক করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সুতা ও কাপড়ের সংকটে নিট এবং টেক্সটাইল খাত

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নিট পোশাক ও বস্ত্রকলগুলোতে (টেক্সটাইল)। স্পিনিং, ডাইং ও ফিনিশিং মিলের উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে আসায় স্থানীয় বাজার থেকে সময়মতো সুতা ও কাপড় পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে উদ্যোক্তাদের চড়া দামে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে, যা লিড টাইম (পণ্য তৈরির সময়) বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) মতে, বিগত দুই বছরে জ্বালানি সংকট ও লোকসানের কারণে প্রায় ১৫০টি বস্ত্রকল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

গাজীপুরে কর্মহীন দেড় লাখ শ্রমিক

শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। কারখানা বন্ধ হওয়া ও উৎপাদন কমার কারণে শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে তৈরি পোশাক খাতেই কাজ হারিয়েছেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। চালুর থাকা কারখানাগুলোর অনেকেই অর্ধেক জনবল নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা

জুলাই মাসে মোট পণ্য রফতানি ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও এটি মূলত আগের তৈরি পোশাকের চালান। নতুন অর্ডারের হার কমে যাওয়া এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে সামনের মাসগুলোতে রফতানি প্রবৃদ্ধি বড় ধাক্কা খেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ববাজারে পোশাক খাতের দীর্ঘদিনের অর্জিত অবস্থান ও সুনাম চরম হুমকির মুখে পড়বে। শিল্প খাতে অবিলম্বে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com