ঈদুল আজহার চাঁদ দেখা গেলেই দেশের কোটি মানুষের মতো গার্মেন্টস শ্রমিকদের মনেও বাড়ি ফেরার টান জেগে ওঠে। কিন্তু এই টান অনেকের জন্য আনন্দের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ায় হিসাব-নিকাশ, অনিশ্চয়তা আর চেপে রাখা কষ্টের গল্প। শহরের বড় বড় শপিংমল যখন ঈদের কেনাকাটায় আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন গার্মেন্টস শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ভাবেন, এই ঈদে অন্তত সন্তানের জন্য একটা নতুন জামা কিনতে পারবেন তো?
সাভারের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করা শারমিন আক্তারের মাসিক বেতন দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। ঈদ সামনে এলেই তার ছয় বছরের ছেলে নতুন জুতা আর পাঞ্জাবির কথা বলে। ছেলের আবদার শুনে তিনি শুধু বলেন, “দেখি বাবা, বোনাস পাইলে কিনে দেব।”
নিজের জন্য নতুন কাপড় কেনার কথা তিনি ভাবেনই না। কারণ বোনাসের টাকা হাতে পাওয়ার আগেই তার ভাগ হয়ে যায়—বাড়ি ভাড়া, গ্রামের মায়ের জন্য কিছু টাকা, যাতায়াত খরচ আর সন্তানের ঈদ।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের অনেকের কাছেই কোরবানির ঈদ মানে নিজের গরু কেনা নয়। অনেক পরিবারে কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। কেউ আত্মীয়ের সঙ্গে শরিকে অংশ নেন, কেউ গ্রামের বাড়িতে বড় ভাই বা চাচার কোরবানির মাংসের অপেক্ষায় থাকেন। আবার অনেকে শুধু সন্তানদের খুশির জন্য ঈদের দিন নতুন কাপড় আর একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতেই হিমশিম খান।
গাজীপুরের শ্রমিক রুবেল মিয়া বলেন, “ছোট মেয়েটা জিজ্ঞেস করছিল, আব্বু আমরা কি গরু কিনব না? কী উত্তর দেব বুঝি নাই।” শেষ পর্যন্ত তিনি গ্রামের কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে শরিকে কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু তাতেও খরচ জোগাতে ওভারটাইম করতে হয়েছে টানা কয়েক সপ্তাহ।
ঈদের আগে শিল্পাঞ্চলজুড়ে আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার নাম বেতন ও বোনাস। টাকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের অনেকেই বাড়ি ফেরার টিকিট কাটতে পারেন না। ফলে ছুটি ঘোষণার পরপরই শুরু হয় তাড়াহুড়া। বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, ট্রেনস্টেশন—সবখানে দেখা যায় মানুষের দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভাড়া আর গাদাগাদি করে যাত্রা যেন প্রতি ঈদের চেনা বাস্তবতা।
এই কষ্টের সবচেয়ে বড় ভার বহন করেন নারী শ্রমিকরা। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বড় অংশজুড়ে আছেন নারীরা। তাদের অনেকেই একা সন্তান নিয়ে কিংবা ছোট শিশুকে কোলে নিয়েই বাড়ি ফেরেন। রাতভর বাসযাত্রা, ভিড়ের মধ্যে শারীরিক হয়রানির ভয়, নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে ঈদযাত্রা তাদের জন্য হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।অনেক নারী শ্রমিক জানান, ছুটি কম থাকায় বাধ্য হয়ে রাতের বাসে উঠতে হয়। কেউ কেউ শিশু কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন বাসের জন্য। ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটে। তারপরও তারা বাড়ি ফেরেন, কারণ গ্রামের বাড়িতে অপেক্ষা করে থাকে সন্তান, বাবা-মা আর পরিবারের মানুষ।
নারী শ্রমিকদের জন্য ঈদ মানে শুধু আনন্দ নয়, বাড়তি দায়িত্বও। কারখানায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করে বাড়ি ফিরে তাদের রান্না, সন্তান সামলানো, আত্মীয়দের জন্য কেনাকাটাসহ নানা কাজ করতে হয়। অনেকের স্বামীও অন্য শহরে কাজ করেন। ফলে পুরো সংসারের চাপ এসে পড়ে একজন নারীর কাঁধে।
আশুলিয়ার এক শ্রমিক নাজমা বেগম বলেন, “ঈদে সবাই খুশি থাকে, কিন্তু আমাদের মাথায় তখন হাজার চিন্তা। বাচ্চাদের নিয়ে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাব কি না, টাকা ঠিকমতো থাকবে কি না—সবসময় ভয় কাজ করে।”
শিল্পাঞ্চলে ঈদের সময় আরেকটি দৃশ্য চোখে পড়ে। কয়েকদিন আগেও যেসব এলাকায় হাজার হাজার শ্রমিকের পদচারণা ছিল, ছুটি শুরু হলে সেসব এলাকা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়। বন্ধ কারখানার সামনে পড়ে থাকে নিস্তব্ধতা। অথচ এই নীরবতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে লাখো শ্রমিক পরিবারের গল্প—যেখানে ঈদের আনন্দও মাপা হয় সামর্থ্য দিয়ে।
তবুও ঈদের সকালে নতুন জামা পরে সন্তানের হাসি দেখলে অনেক শ্রমিক সব কষ্ট ভুলে যান। কেউ হয়তো নিজের জন্য কিছু কিনতে পারেননি, কেউ কোরবানি দিতে পারেননি, কেউ আবার ভিড় আর দুর্ভোগ পেরিয়ে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি পৌঁছেছেন। কিন্তু পরিবারের পাশে কয়েকটা দিন থাকতে পারার আনন্দই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় ঈদ।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে যেসব শ্রমিকের ঘামে, তাদের ঈদের গল্প তাই কেবল উৎসবের নয়; এটি ত্যাগ, বঞ্চনা, সংগ্রাম আর পরিবারকে ঘিরে ছোট ছোট স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার গল্পও।


