ভোরের আলো তখনো ম্লান, কুয়াশার চাদর সরিয়ে রাজধানী ঢাকা যখন মাত্র জাগতে শুরু করে, তখনই হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিকদের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর রাজপথ। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি প্রস্তর গার্মেন্টস সেক্টরের যে চিত্র আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, তার প্রতিটি সুতোর ভাঁজে আর সেলাইয়ের ফোঁড়ে লুকিয়ে আছে এই শ্রমিকদের ত্যাগের মহিমা। এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ার, চোখে একরাশ ক্লান্তি আর অন্তরে বেঁচে থাকার অদম্য সংগ্রাম নিয়ে তারা ছুটে চলেন মেশিনের চাকার সাথে পাল্লা দিয়ে। কিন্তু যাদের ঘামে এই দেশের সমৃদ্ধির চাকা সচল থাকে , তাদের জীবনযুদ্ধের গল্পটি শুধু সংগ্রামের নয়, বরং গভীর বেদনার ।
অংকের হিসাবে সাফল্য, আড়ালে দীর্ঘশ্বাস
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে। দেশজুড়ে প্রায় ৫০ লক্ষ শ্রমিকের অমানবিক পরিশ্রম এই সাফল্যের মূল ভিত্তি। কিন্তু এই নজরকাড়া সাফলতা আর পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে যায় শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, অনিশ্চিত ভবিষ্যত এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের নির্মম বাস্তবতা। বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি যখন গর্বের প্রতীক, তখন সেই গৌরবের বুননে হারিয়ে যায় ঘামে সিক্ত শ্রমিকের পরিশ্রমের গল্প ।
মজুরি বৈষম্য ও ‘আধুনিক দাসত্বের’ ছায়া
মূল্যস্ফীতি, দূর্যোগ, যুদ্ধ, বৈশ্বিক রাজনীতি আর দেশের অস্থিতিশীলতার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আকাশচুম্বী, তখন শ্রমিকরা ন্যূনতম তেইশ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে রাস্তায় নামলে তাদের ভাগ্যে জোটে মামলা ও আইনি ঝুঁকি । বাংলাদেশে প্রায় ৪৪,০০০ শ্রমিককে আইনি জটিলতার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র তাদের ন্যায্য পাওনার দাবির জন্য ।
বাস্তবতা আরও রূঢ়; বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা আজও বিশ্বের সবচেয়ে কম মজুরি পাওয়া শ্রমিকদের তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছেন । ৪০ শতাংশ শ্রমিক জানে না তাদের সার্ভিস বুকে কী লেখা রয়েছে। প্রায় ২২ শতাংশ কারখানায় আজও নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না । শ্রম আইন অনুযায়ী সাপ্তাহিক ছুটির বিধান থাকলেও প্রায় ৭৮ থেকে ৭৯ শতাংশ শ্রমিকই সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। অনেক শ্রমিক দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য হন ।
নারী শ্রমিকের দুস্তর পথচলা
তৈরি পোশাক শিল্পের প্রাণশক্তি মূলত নারীরা; মোট শ্রমিকের সিংগভাগ নারী । এই শিল্পের হাত ধরেই বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছেন । তারা আজ দলবেঁধে কারখানায় যান, নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে শিখছেন । কিন্তু এই স্বাধীনতার মুদ্রার উল্টো পিঠটি অত্যন্ত অন্ধকার।
গ্লোবাল জাস্টিস অর্গানাইজেশনের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন । অন্যদিকে সুপারভাইজার বা ম্যানেজারদের দ্বারা হেনস্তা হওয়া যেন একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে । যেসব কারখানায় অ্যান্টি-হ্যারাসমেন্ট কমিটি আছে, সেখানেও এই হেনস্তা ঠেকানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন সুবিধা বা পেনশনের মতো মৌলিক অধিকারগুলো আজও নিশ্চিত হয়নি । ভোরে উঠে লাইন দিয়ে বাথরুম শেয়ার করা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে সারাদিন দাঁড়িয়ে কাজ করা, এটি একজন নারী শ্রমিকের এক নিরন্তর সংগ্রাম ।
প্রাণের বিনিময়ে প্রবৃদ্ধি: রানা প্লাজার অন্ধকার অধ্যায়
২০১২ সালের তাজরীন ফ্যাশনস এবং ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্রাডেজি বাংলাদেশের জন্য একটি অন্ধকার অধ্যায়। প্রাণের বিনিময়ে প্রবৃদ্ধি কখনো কাম্য হতে পারে না । রানা প্লাজার ভয়াবহ স্মৃতি এখনো শ্রমিকদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কারখানার নিরাপত্তায় কিছুটা উন্নতি হলেও সেই পরিসংখ্যান সন্তোষজনক নয় । ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, কেবল মাত্র ২০ শতাংশ কারখানা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। এখনো কারখানা গুলোতে শ্রমিকরা জরাজীর্ণ ভবনের ভেতরে আগুনের ঝুঁকি আর জীবন বাজি রেখে কাজ করে চলেছেন ।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি
একটানা পরিশ্রম, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব এবং ওভারটামের মাধ্যমে শ্রমিকদের নিত্যকার বাস্তবতা। জরিপ বলছে, প্রায় ৭৭.১ শতাংশ শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও পেশি ব্যথায় ভোগেন । যারা অর্থনীতি সচল রাখছে, তাদের কেন মেঝেতে শুয়ে শান্তি খুঁজতে হয়? দুপুরের বিরতিতে যখন তারা কারখানার মেঝেতে কয়েক মিনিটের জন্য চোখ বুজেন তখন দার্শনিকের চোখে হয়তো দৃশ্যটি একটি রাষ্ট্রের বিবেকের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রত্যাশা ও আগামীর পথ
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বজুড়ে সম্ভাবনার প্রতীক। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে । ন্যায্য মজুরি, ন্যায্য মর্যাদা, অগ্নি-নিরাপত্তা বাস্তবায়ন এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার প্রদান ব্যাতীত পোশাক শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় ।
রাষ্ট্র আজও শ্রমিকবান্ধব হয়ে উঠে নি। আর গার্মেন্টস শ্রমিকদের ঘাম তো সেখানে আরও বেশি অবমূল্যায়ন করা হয়। তবে আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংশ্লিষ্টরা শ্রমিকদের বেতন কাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করছে । যদি শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য বুঝে পায়, তবেই এদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আরও মজবুত হবে ।



