বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের পাট খাত থেকে রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। পাটের সুতা ও বস্তার মোট রপ্তানি আয় বাড়লেও ধাক্কা খেয়েছে বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার। তবে সুতার রপ্তানি আয় বাড়ার পেছনে পণ্যের বিক্রির পরিমাণ নয়, বরং কাঁচা পাটের চড়া দামকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
সুতা ও বস্তা রপ্তানির চিত্র
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে পাটের বস্তা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৩ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, পাটের সুতা রপ্তানি ১৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ কোটি ডলারে।তবে মূল্যের দিক থেকে আয় বাড়লেও পরিমাণের দিক থেকে সুতার রপ্তানি কমেছে ২ শতাংশ। বিদায়ী বছরে ৪ লাখ ২৮ হাজার টন পাটের সুতা রপ্তানি হয়েছে, যেখানে তার আগের বছর রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩৮ হাজার টন।
আয় বাড়ার মূল কারণ কাঁচা পাটের দাম
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিকের মতে, বাজারে কাঁচা পাটের দাম বৃদ্ধির কারণে মূলত রপ্তানি মূল্য বেড়েছে। আগে প্রতি মণ কাঁচা পাট ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বিদায়ী অর্থবছরে তা কিনতে হয়েছে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায়। এর ফলে ১ হাজার ডলার মূল্যের পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম বেড়ে ১,২০০ থেকে ১,৩০০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন বাজারে রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়া গেলে দেশের পাট খাত থেকে বছরে ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।
ধাক্কা খেয়েছে বহুমুখী পাটপণ্য
বিশ্বজুড়ে বহুমুখী পাটপণ্যের বড় সম্ভাবনা থাকলেও এ খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে। বিদায়ী অর্থবছরে ৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের বহুমুখী পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম।
উদ্যোক্তারা জানান, ভূরাজনৈতিক সংকট ও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। ইইউ অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় অন্যান্য শৌখিন বা আনুষঙ্গিক পণ্যের বিক্রি কমে গেছে। পাশাপাশি দেশে কাঁচা পাটের অতিরিক্ত দামের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়
বর্তমানে বিশ্ববাজারে পাটের তৈরি গৃহসজ্জার পণ্য, শপিং ব্যাগ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, বাগান করার সামগ্রী, অটোমোবাইল, প্যাকেজিং এবং পাটকাঠির তৈরি চারকোলের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।
বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ক্রিয়েশন’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম জানান, সুতা ও বস্তায় মুনাফার হার খুবই কম হওয়ায় কাঁচা পাটের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রপ্তানি বাড়াতে নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবনে গবেষণা করতে হবে। পাশাপাশি চীন ও ভারতের মতো বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

