বিশ্বের তৈরি পোশাক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বজায় রাখলেও নানা অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের পোশাক খাত। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাব, লাগামহীন উৎপাদন খরচ, চট্টগ্রাম বন্দরের ধীরগতি এবং দীর্ঘ লিড টাইমের (পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সময়) কারণে বৈশ্বিক ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে নজর দিচ্ছেন।
এই সুযোগে বাংলাদেশের পোশাক কার্যাদেশের একটি অংশ ভারতের বাজারে চলে যাচ্ছে।খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন বাজারে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিপমেন্টের দীর্ঘসূত্রতাই ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করছে। তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অর্ডারের পণ্য জাহাজে তুলতে গড়ে ৬০ থেকে ৯৫ দিন সময় লাগে। সেখানে ভারতে এ সময় লাগে ৪৫ থেকে ৬০ দিন, ভিয়েতনামে ৬০ দিন এবং চীনে মাত্র ৩২ দিন।
এই লিড টাইমের বড় ব্যবধানই বিদেশি বায়ারদের ভারতসহ অন্য প্রতিযোগী দেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।এর ওপর সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলোতে চরম গ্যাসসংকট দেখা দিয়েছে। অপর্যাপ্ত গ্যাসের কারণে কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বাধ্য হয়ে চড়া খরচে ডিজেল জেনারেটর চালাতে হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে শিল্পে গ্যাসের দাম প্রায় ২৮৬ শতাংশ, বিদ্যুতের দাম ৩৩ শতাংশ এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক উৎপাদন খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এর জের ধরে গত তিন বছরে প্রায় চার শ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।পরিস্থিতি নিয়ে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, ক্রেতারা সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে না নিলেও দেশের জ্বালানিসংকট ও বাড়তি খরচ বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলও সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পোশাক খাতের বর্তমান অচলাবস্থার চিত্র তুলে ধরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তির তাগিদ দিয়েছে।অন্যদিকে, ভারত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের টেক্সটাইল খাতের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ‘পিএলআই’ প্রকল্পের আওতায় মোটা অঙ্কের প্রণোদনা, ‘পিএম মিত্র’ পার্কের মাধ্যমে একই স্থানে সব সেবা নিশ্চিত করা এবং নিজস্ব তুলার বড় উৎসের কারণে দেশটি দ্রুত পণ্য সরবরাহে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।
পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের চেষ্টা ভারতের বাজারকে আরও শক্তিশালী করছে।অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে মূল সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। বিশ্বমানের সবুজ কারখানা ও দক্ষ শ্রমশক্তি থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মক্ষমতা বাড়ানো এবং লিড টাইম কমিয়ে আনা না গেলে রপ্তানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।


