ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) অবিক্রীত পোশাক, অনুষঙ্গ ও জুতা ধ্বংস বা পোড়ানোর ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় বিশ্ব ফ্যাশন শিল্পে বড় পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইইউ-এর ‘টেকসই পণ্যের পরিবেশবান্ধব নকশা বিধিমালা’ শীর্ষক এই নতুন নীতিমালার ফলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার ইউরোপে পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ সুরক্ষার এই আইনি বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনই সময়োপযোগী প্রস্তুতি নিলে এটি একটি সম্ভাবনাময় সুযোগেও রূপান্তরিত হতে পারে।ইউরোপীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহাদেশটিতে প্রতিবছর বাজারে আসা পোশাকের ৪ থেকে ৯ শতাংশ অবিক্রীত অবস্থায় নষ্ট বা ধ্বংস করে ফেলা হয়। এতে বার্ষিক প্রায় ৫৬ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে।
এই অপচয় থামাতে গত ১৯ জুলাই থেকে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অবিক্রীত পণ্য ধ্বংসে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইইউ। ২০৩০ সাল থেকে মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোও এই আইনের আওতায় আসবে। নতুন নিয়মে পণ্য না পুড়িয়ে তা মূল্যছাড়ে বিক্রি, সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দান অথবা সংস্কার করে পুনঃব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানি ৯.৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৪১.১০ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমেছে।
এই সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৬.৪৩ শতাংশ কমেছে, যার ফলে সেখানে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা ২২.৭৩ শতাংশ থেকে ২১.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে একই সময়ে প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামের রপ্তানি ০.৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।অবিক্রীত পণ্য ধ্বংসের সুযোগ সীমিত হওয়ায় ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো তাদের ক্রয়ের মডেলে কৌশলগত পরিবর্তন আনছে। এখন থেকে দীর্ঘমেয়াদি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বিশাল অর্ডারের বদলে চাহিদানুযায়ী ছোট চালানে দ্রুত পণ্য সরবরাহের দিকে ঝুঁকছে ক্রেতারা।
একই সঙ্গে অনলাইন কেনাকাটায় রিটার্ন বা ফেরত আসার হার কমাতে মান নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এছাড়া পণ্যের কাঁচামাল থেকে শুরু করে এর পরিবেশগত স্থায়িত্ব ট্র্যাকিংয়ের জন্য ‘ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট’ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।এই পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইউরোপের বাজারে টিকে থাকতে এবং নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশাল পরিমাণের প্রথাগত অর্ডারের পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে ছোট চালান সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কারখানায় কাঁচামালের উৎস ও পরিবেশগত মান অনুসরণের জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
এছাড়া কারখানায় পোশাকের বর্জ্য বা ঝুট পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি নজর দিয়ে উৎপাদন ত্রুটি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। সঠিক সময়ে পরিপালন নীতি মেনে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে ইউরোপের এই পরিবর্তনশীল বাজারে বাংলাদেশ তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবে।


