রাজধানীসহ সারা দেশে তীব্র আকার ধারণ করেছে গ্যাস সংকট। বাসা-বাড়ির রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সিএনজি স্টেশন—সর্বত্রই এখন জ্বালানির তীব্র অভাব। সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানালেও, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস এবং এলএনজি আমদানির অনিশ্চয়তার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে সংকট মেটানো নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চাহিদা ও সরবরাহে বিশাল ঘাটতি

পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে দৈনিক সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট—যার মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১৬২ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি থেকে আসছে ৭১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে।

গ্যাসের অভাবে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশনগুলোতে শত শত গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছে। সিএনজি পাম্পে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক চালক নির্ধারিত পরিমাণ গ্যাসও নিতে পারছেন না।বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাগ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিন ২৫২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৭০ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট। দেশে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও গ্যাসের অভাবে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটেরও কম। অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় সামাল দিতে সরকারকে লোডশেডিংয়ের পথ বেছে নিতে হচ্ছে।

কমেছে দেশীয় উৎপাদন, ধীরে এগোচ্ছে নতুন প্রকল্প

গত সাড়ে ছয় বছরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যেখানে মোট সরবরাহ ছিল ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে—অর্থাৎ সরবরাহ কমেছে ২৬.২ শতাংশ।ঘাটতি মেটাতে সরকার ১৫০টি কূপ খনন ও রি-ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা নিয়েছে।

এর মধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হওয়ায় দৈনিক ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। তিতাস, বাখরাবাদ, মোবারকপুর ও সুনেত্র এলাকায় গভীর কূপ খননের উদ্যোগের পাশাপাশি বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও চলছে। তবে অনুসন্ধান ও উৎপাদন শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

এলএনজি আমদানিতে আন্তর্জাতিক সংকট

দেশীয় ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং ডলার সংকটের কারণে কার্গো আগমন কমেছে। মহেশখালীতে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি হয়েছে, যা ২০২৮ সালের ডিসেম্বরে চালু হতে পারে। তবে এই টার্মিনাল কার্যকর রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

বিকল্প জ্বালানি ও ভবিষ্যৎ করণীয়

সাময়িকভাবে সামাল দিতে ফার্নেস তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বর্তমান চড়া এলএনজি মূল্যের তুলনায় তা কিছুটা সহনীয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকট কাটাতে কেবল আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশীয় সমুদ্র ও স্থলভাগে নতুন কূপ খনন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতের সংস্কারে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের একক নির্ভরতা কমিয়ে তেল, কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com