বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দাপট অব্যাহত থাকলেও পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না। ফলে রপ্তানি আয় বাড়লেও মূল্য সংযোজনের দিক থেকে পিছিয়ে থাকছে দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাত।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) জানায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ১,০৫৭ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের (৯৯৭ কোটি ৪ লাখ ডলার) তুলনায় ৬.১০ শতাংশ বেশি।
বেসিক পণ্যের ওপরই প্রধান নির্ভরতা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির সিংহভাগই আসে তুলনামূলক কম দামি বা ‘বেসিক’ ক্যাটাগরির পণ্য থেকে। আলোচ্য সময়ে বেসিক পণ্য থেকে আয় হয়েছে ৮২৫ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৭৮.০৬ শতাংশ (গত বছর ছিল ৭৭.০৮%)। অর্থাৎ বেসিক পণ্যের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
এই ক্যাটাগরির মধ্যে ট্রাউজার্স ও শর্টস থেকে আয় হয়েছে ৩২৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার (প্রবৃদ্ধি ৬.৫২%)। সোয়েটার ও কার্ডিগানে ৯.৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে আয় ২০৪ কোটি ৮২ লাখ ডলার এবং টি-শার্ট থেকে এসেছে ১৫৮ কোটি ১৮ লাখ ডলার। এছাড়া শিশুদের পোশাকে সর্বোচ্চ ১০.১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
উচ্চমূল্য ও আধুনিক পোশাকে প্রবৃদ্ধি নামমাত্র
বৈচিত্র্যময় ও তুলনামূলক বেশি দামি ‘অ্যাডভান্সড’ ক্যাটাগরির পোশাকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১.৪২ শতাংশ। প্রথম প্রান্তিকে এ খাত থেকে আয় এসেছে ১৪৭ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। ফলে মোট পোশাক রপ্তানিতে এই ক্যাটাগরির অবদান কমে ১৩.৯৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত বছর ছিল ১৪.৬৩ শতাংশ।
অ্যাডভান্সড ক্যাটাগরির জ্যাকেট ও কোটে ৩.৪৯ শতাংশ এবং টেকনিক্যাল ওয়্যারে ৮.০৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও অন্য পোশাকগুলোতে বড় ধস নেমেছে। এর মধ্যে ড্রেস রপ্তানি কমেছে ১০.৬৬ শতাংশ, স্পোর্টসওয়্যারে ১১.২৪ শতাংশ এবং স্যুট রপ্তানিতে পতন ঘটেছে ১৪.৪৮ শতাংশ। এছাড়া ‘সেমি-বেসিক’ ক্যাটাগরির শার্ট ও ব্লাউজ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১.৭৭ শতাংশ।
উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন আধুনিকায়নের পরামর্শ
খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দামি পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় এ ধরনের পোশাকের উৎপাদন অনেক কম।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, শুধু বেসিক পোশাকে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী উচ্চমূল্যের পোশাকের উৎপাদন বাড়াতে হবে। তবে এই রূপান্তর রাতারাতি সম্ভব নয়; এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও সাপ্লাই চেইনের আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
তিনি তুরস্কের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভৌগোলিক সুবিধার কারণে তুরস্ক ইউরোপীয় বাজারে দ্রুত পণ্য সরবরাহ (কম লিড টাইম) করতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি সংকটের (গ্যাস ও বিদ্যুৎ) কারণে সাধারণ পণ্যের উৎপাদনই ব্যাহত হচ্ছে।
তবে দেশে নতুন ও উন্নত ক্যাটাগরির পোশাক তৈরির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা ধরে রেখে পরিকাঠামো ও সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি মত দেন।


