ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাকের অন্যতম জনপ্রিয় আইটেম ডেনিম রপ্তানিতে নিজেদের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি থেকে আগস্ট) ২৭ দেশের এই ব্লকে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ইইউর মোট ডেনিম আমাদানির প্রায় ২৯.৪০ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেনিম সরবরাহে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো এখন অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থানে থাকা চীন বর্তমানে ইইউর ডেনিম বাজারে ৫ নম্বর অবস্থানে রয়েছে, তাদের দখলে রয়েছে মাত্র ৬.৬৭ শতাংশ শেয়ার। অন্যদিকে, আরেক প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম রয়েছে নবম স্থানে, যাদের বাজার অংশীদারিত্ব ২ শতাংশেরও কম।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইউরোস্ট্যাট’-এর উপাত্ত অনুযায়ী, আলোচ্য আট মাসে ইইউ জোট মোট ৩৪১ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক আমদানি করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ এককভাবে রপ্তানি করেছে ১০০ কোটি ডলার (৮৭ কোটি ইউরো)। এই সময়ে চীনের রপ্তানি ছিল ২৩ কোটি ডলার এবং ভিয়েতনামের রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ডলারে। ২০১৭ সালে চীনকে পেছনে ফেলে প্রথম ডেনিম রপ্তানিতে শীর্ষে উঠে আসে বাংলাদেশ, আর সেই থেকে টানা শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে দেশীয় তৈরি পোশাক খাত।
তবে বিশ্ববাজারের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে একক বছরের হিসাবে গত আট মাসে বাংলাদেশে ডেনিম রপ্তানি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। গত বছরের একই সময়ে যেখানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১০৬ কোটি ডলার, সেখানে এবার তা কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। তবে একক মাস হিসেবে আগস্টে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ; এই মাসে জোটে ১৫ কোটি ডলারের ডেনিম পাঠানো হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে ডেনিমের কদর বাড়ার মূল কারণ হলো স্থানীয় পোশাক কারখানার আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং মানসম্মত ওয়াশিং ও ফিনিশিং। এছাড়া বেসিক ডেনিম থেকে শুরু করে উন্নত মানের উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে বাংলাদেশি কারিগর ও শ্রমিকরা এখন বেশ দক্ষ।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, আধুনিক প্রযুক্তির মেশিনারিজ ব্যবহার এবং পোশাকের বাড়তি মূল্য সংযোজন (ভ্যালু এডিশন) বাংলাদেশকে প্রতিযোগীদের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে ডেনিম ফেব্রিক্স তৈরি করে এমন ৫০টি কারখানা রয়েছে, যেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
এসব কারখানায় প্রতি মাসে প্রায় চার কোটি গজ কাপড় উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট ডেনিম চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ করে। চাহিদা পূরণে বাকি ৩০ শতাংশ ডেনিম কাপড় ভারত, চীন ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডেনিম ব্যবহার করায় পোশাক তৈরিতে সময় ও খরচ উভয়ই কমছে। এছাড়া বর্তমানে দেশে ৫ ১০০টিরও বেশি কারখানায় ডেনিম দিয়ে জিন্স পোশাক তৈরি করা হয়।
ইইউর ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তান। আট মাসে ৬১ কোটি ডলার রপ্তানি করে তাদের শেয়ার ১৭.৭৮ শতাংশ। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে থাকা তুরস্ক ও তিউনিসিয়ার শেয়ার যথাক্রমে ১৪.৮২ ও ৭.৪৪ শতাংশ। তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলোর মধ্যে যথাক্রমে মিসর (৬ষ্ঠ), কম্বোডিয়া (৭ম), মরক্কো (৮ম), ভিয়েতনাম (৯ম) এবং ভারত (১০ম) স্থানে অবস্থান করছে।শুধু ইউরোপ নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশি ডেনিমের দাপট অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘অফিস অব দ্য টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলস’ (অটেক্সা)-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬১ কোটি ডলার, যা দেশটির মোট ডেনিম আমদানির ২৬ শতাংশ। এই বাজারে ৫৫ কোটি ডলার রপ্তানি করে দ্বিতীয় স্থানে মেক্সিকো এবং ৪৫ ও ৩৫ কোটি ডলার রপ্তানি করে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে যথাক্রমে চীন ও ভিয়েতনাম।


