ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম দিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও খুচরা বিক্রেতাদের হাতে পণ্যের বাড়তি মজুত থাকায় পোশাক আমদানিতে শ্লথগতি ছিল। তবে বছরের মাঝামাঝি এসে ইউরোপে নতুন করে পোশাকের ক্রয়াদেশ ও আমদানি বাড়তে শুরু করেছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইউরোস্ট্যাট’-এর তথ্যের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’ (বিএভি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

ইউরোপে আমদানির বর্তমান চিত্র

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ইইউ মোট ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরো মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩.৮৩ শতাংশ কম। এ সময়ে আমদানিকৃত পোশাকের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০৬ কোটি ৭৫ লাখ কেজি।

তবে মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত টানা চার মাসে ইউরোপের পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২.৬ শতাংশ বেড়েছে। মূলত গ্রীষ্মের শেষ ও শীত মৌসুমের পোশাক বাজারে আসা এবং বসন্তকালীন বেচাকেনা ভালো হওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা নতুন করে ক্রয়াদেশ দেওয়া শুরু করেন।

বাংলাদেশের অবস্থান ও বড় চ্যালেঞ্জ

ইউরোপের বাজারে সার্বিক কেনাকাটা বাড়লেও বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি অনুকূলে আসেনি। প্রথম আট মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১.৬৭ শতাংশ। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ ১১৯৩ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩৫০ কোটি ইউরো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমার প্রধান কারণ পণ্যের পরিমাণ হ্রাস নয়, বরং পোশাকের একক মূল্য কমে যাওয়া। আগের চেয়ে কম দামে পণ্য সরবরাহ করায় মোট আয় বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে ইইউর মোট বাজারে বাংলাদেশের অংশ ২১.৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯.৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

চীন ও ভিয়েতনামের দাপট

ইউরোপের বাজারে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন একমাত্র ব্যতিক্রম, যাদের রপ্তানির পরিমাণ ও মূল্য দুটোই বেড়েছে। চীন ইইউতে রপ্তানি ২.৩৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১৯৭১ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে এবং বাজারে তাদের অংশ দাঁড়িয়েছে ৩২.৭ শতাংশে। অন্যদিকে, প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১০.১১ শতাংশ বাড়িয়ে ভিয়েতনামও তাদের আয় ৪.৪৬ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও বাণিজ্যঝুঁকি

ইউরোপীয় কমিশনের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ইইউর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি কমে ২.৪ শতাংশে নামতে পারে। তবে এ ইতিবাচক ধারার পেছনে কিছু বড় ঝুঁকিও রয়েছে:

  • জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
  • ভোক্তা অসন্তোষ: সম্প্রতি ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘট ও দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা বড়দিনের কেনাকাটায় প্রভাব ফেলতে পারে।
  • নতুন নীতি ও মুক্তবাণিজ্য: ২০২৭ সাল থেকে ইইউর নতুন জিএসপি (GSP) বিধিমালা চালু হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (FTA) কার্যকর হলে ভারতের রপ্তানিকারকরা বিশেষ সুবিধা পাবেন, যা বাংলাদেশের বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com