বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখলেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত বৈচিত্র্য আনতে পারছে না বাংলাদেশ। দেশের পোশাক রপ্তানির সিংহভাগই এখনো কটন বা তুলাভিত্তিক মৌলিক (বেসিক) ও কম দামি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে উচ্চমূল্য, প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশেষায়িত পোশাকের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি এখনো বেশ অপ্রতুল।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের (বিএভি) এক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭৭ শতাংশই (৭৬.৯৪%) ছিল মৌলিক বা বেসিক ক্যাটাগরির। অথচ একই সময়ে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে এসব বেসিক পণ্যের অংশ ছিল ৬১.৫৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪২৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশের ছিল ৩৮.৮২৫ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এর মধ্যে প্যান্ট, শর্টস ও স্কার্টের মতো ‘বটমওয়্যার’ থেকে এসেছে রপ্তানির ৩৩.৬৮ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক বাজারে এর চাহিদা ২১.৬৮ শতাংশ। একইভাবে টি-শার্ট ও ভেস্ট থেকে আসে ১৮.৬৪ শতাংশ আয়, বৈশ্বিক বাজারে যার অংশ মাত্র ১০.০৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, দামি ও বিশ্ববাজারে চাহিদা বেশি এমন পণ্যে পিছিয়ে রয়েছে দেশ। জ্যাকেট ও কোটের মতো ‘আউটারওয়্যার’ বিশ্ববাজারের ১৩.৪৫ শতাংশ দখল করে থাকলেও বাংলাদেশের রপ্তানিতে এর অংশ মাত্র ৩.৮৩ শতাংশ। আর গ্লাভস বা হোসিয়ারির মতো আনুষঙ্গিক পণ্যে বাংলাদেশের অবদান মাত্র ০.৩৫ শতাংশ, যা বিশ্ববাজারে ৭.৫২ শতাংশ। সব মিলিয়ে আউটারওয়্যার, ড্রেস, স্পোর্টসওয়্যার ও স্যুটের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈশ্বিক চাহিদা ৩০.৪৬ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের ঝুড়িতে এর উপস্থিতি মাত্র ৯.৩৫ শতাংশ।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পথে থাকায় এখনই পণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। আগামীতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতার চাপ সামলাতে এটি বড় ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, কেবল রপ্তানির পরিমাণ না বাড়িয়ে উচ্চমূল্যের ও নতুন ডিজাইনের পোশাক তৈরিতে জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশ পোশাকই কৃত্রিম তন্তু বা নন-কটননির্ভর। অথচ বাংলাদেশের রপ্তানিতে নন-কটনের হার মাত্র ২৭ শতাংশের কাছাকাছি। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সিনথেটিক ও ম্যান-মেইড ফাইবার (এমএমএফ) পোশাকে নজর দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, পোশাক খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে বৈচিত্র্যময় নন-কটন পণ্য, প্রযুক্তিভিত্তিক পোশাক ও নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ডে প্রবেশ করতেই হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ খাতের অগ্রগতিতে উন্নত কাঁচামাল ও এমএমএফ-এর স্থানীয় সরবরাহ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, নকশা উন্নয়ন ও দক্ষ জনবল তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
এদিকে তথ্যে দেখা গেছে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে কিছুটা অমিল রয়েছে। তাদের দুই ও ছয় অঙ্কের এইচএস কোডের তথ্যে প্রায় ৩.৩৮ শতাংশ (প্রায় ১.৩১৩ বিলিয়ন ডলার) ফারাক দেখা গেছে, যেখানে বৈশ্বিক তথ্যে এই পার্থক্যের হার ছিল মাত্র ০.৫৯ শতাংশ।
সংকট কাটিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সীমিত পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নন-কটন ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে যাওয়াটাই এখন দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ।


