ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে আগামী জানুয়ারি থেকে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এতদিন শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুবিধার কারণে ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। তবে ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হতে যাওয়ায় একই সুবিধা পেতে যাচ্ছে ভারতও। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউরোপে নিজেদের তৈরি পোশাক রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নয়াদিল্লি।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইউরোপের বাজারে বর্তমান অবস্থান ধরে রাখাই হবে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কাঁচামাল আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং পণ্য সরবরাহের দীর্ঘ সময়সীমা বা ‘লিড টাইম’-এর কারণে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশ।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান
বর্তমানে ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাক সরবরাহে ২৭ শতাংশ অংশ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে চীন। উচ্চমূল্যের সিনথেটিক পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধা ছাড়াই বাজারটিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে তারা। ২২.৫ শতাংশ বাজার অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে সাধারণ বা বেসিক পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো ইউরোপের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ।
তালিকায় ১০.৫ শতাংশ অংশ নিয়ে তৃতীয় স্থানে তুরস্ক এবং প্রায় ৫ শতাংশ অংশ নিয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত। পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকলেও নতুন বাণিজ্য চুক্তির ফলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। জানুয়ারি থেকে শূন্য শুল্কে ভারতীয় পণ্য প্রবেশ করতে শুরু করলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে টান পড়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, গত বছর শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় ইউরোপের বাজারে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ।
লিড টাইম ও উৎপাদন খরচে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাক উৎপাদক এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালাম জানান, শুল্কের সমতা তৈরি হলে সরকারের নীতিসহায়তা ও শিল্পের নিজস্ব প্রস্তুতিই মূল নিয়ামক হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, “প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সস্তা শ্রমের নির্ভরতা ছেড়ে প্রযুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ও শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।”
তিনি আরও পরামর্শ দেন, ইইউ-এর সঙ্গে দ্রুত মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু করা এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা অন্তত তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো দীর্ঘ ‘লিড টাইম’। দেশে ওভেন ও সিনথেটিক কাপড়ের প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল চীন বা ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে অর্ডার পাওয়ার পর পণ্য ইউরোপে পৌঁছাতে গড়ে ৬০ থেকে ৮০ দিন সময় লেগে যায়। অন্যদিকে, নিজস্ব তুলা ও কাপড়ের সমন্বিত ব্যবস্থা থাকায় ভারত মাত্র ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যেই পণ্য সরবরাহ করতে পারে।
বন্দর সুবিধা ও লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতা
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জে রয়েছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পোশাকবাহী জাহাজ সরাসরি ইউরোপে না গিয়ে প্রথমে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দরে যায়, যা বাড়তি সময় ও খরচ তৈরি করে। অন্যদিকে, উন্নত বন্দর অবকাঠামোর কারণে ভারত দ্রুত ও কম খরচে শিপমেন্ট পাঠাতে সক্ষম।
এর পাশাপাশি দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, অতিরিক্ত মূল্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের মতো সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভারতের বড় লক্ষ্যমাত্রা ও বিশ্ববাজারের চাপ
ইইউ-এর সঙ্গে চুক্তি কার্যকরের পর ২০২৭ সালের মধ্যে ইউরোপে ৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্য নিয়েছে ভারত। এটি বাস্তবায়িত হলে বাজারে দেশটির অংশ ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছাবে
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশকে বহুমুখী চাপের মুখে পড়তে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের কারণে চীনের পণ্য যেমন ইউরোপে প্রবেশ করবে, তেমনি ভিয়েতনামের বিদ্যমান সুবিধা এবং ভারতের নতুন শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা তৈরি করবে। পরিস্থিতি সামলাতে বিকল্প বাজারের সঙ্গে চুক্তি এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার তাগিদ দেন তিনি।


