অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে চলেছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। কার্যকর শীতলীকরণ ব্যবস্থা না থাকলে তাপজনিত চাপে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে এক সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের যৌথ সহযোগিতার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গরমের দিনে কারখানার ভেতরে তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, উপযুক্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা না থাকলে তীব্র তাপদাহে শ্রমিকদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তবে গবেষকরা জানান, পুরো কারখানায় ব্যয়বহুল শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না বসিয়েও পর্যাপ্ত ফ্যান ব্যবহার, স্বাভাবিক বায়ু চলাচল বৃদ্ধি, প্রচুর পানীয় জল সরবরাহ এবং ছাদের উত্তাপ কমানোর মতো সাশ্রয়ী পদক্ষেপেও এই তাপজনিত চাপ অনেকটা কমানো সম্ভব।

তাপদাহের এই প্রভাব শুধু কারখানাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা প্রভাব ফেলছে পুরো অর্থনীতিতে। ল্যানসেট কাউন্টডাউন-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপদাহের কারণে বাংলাদেশে আনুমানিক ২৯ বিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ বা ২৪ বিলিয়ন ডলারের আয়ক্ষতির সমান।

শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, তাপদাহের কারণে অনেক শ্রমিক পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও শারীরিক ক্লান্তিতে ভুগছেন। কাজের মনোসংযোগ কমায় পোশাক তৈরিতে ভুল বা ত্রুটি বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এবং জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের কারণে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মত দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।

অন্যদিকে, কারখানায় পরিবেশ ঠান্ডা রাখার বিকল্প ব্যবস্থা নিতে গিয়ে মালিকদের পরিচালন ব্যয়ও কিছুটা বাড়ছে। এ বিষয়ে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র গরমের এই ঝুঁকি মোকাবিলা কেবল ফ্যান বা কুলার বসানোর বিষয় নয়; বরং কারখানার সামগ্রিক নকশা, উন্নত বায়ু চলাচল এবং বিদ্যুৎ দক্ষতার সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত এই খরচের দায়ভার কেবল উৎপাদকদের ওপর না চাপিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়াদেশ ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে যৌথ বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারা। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ঝুঁকি কাটাতে সরকার, কারখানার মালিক ও বিদেশি ক্রেতাদের অবিলম্বে একটি সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com