জ্বালানি সংকটের প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পে। গ্যাসের স্বল্প চাপ এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহৃত থাকছে। কোথাও সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে, আবার কোথাও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে দিনের বড় সময়জুড়ে যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া শুধু উৎপাদনের পরিমাণ কমাচ্ছে না, পণ্যের মানের ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে যেসব বস্ত্র ও পোশাক নির্দিষ্ট মান ও সময়সীমার মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করার কথা, সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি। এতে ক্রেতাদের আস্থার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার লিটল স্টার স্পিনিং মিলস ভিন্ন একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও কারখানাটির উৎপাদন পুরোপুরি থেমে যাচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে বড় ক্ষমতার লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ভিত্তিক এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থা।
গ্রিড বন্ধ হলেও চলছে উৎপাদন
লিটল স্টার স্পিনিং মিলসে স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ৬০০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা ক্ষমতার লিথিয়াম ব্যাটারি। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে এই ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সঞ্চিত হয়। গ্রিডের সরবরাহ বন্ধ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাটারি থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়।
ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আকস্মিক ছেদ পড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সঞ্চিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কারখানার বিভিন্ন ইউনিট কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সচল রাখা সম্ভব।
লিটল স্টার স্পিনিং মিলসের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫৪ হাজার স্পিন্ডল। বর্তমানে গ্যাস, গ্রিডের বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ এবং লিথিয়াম ব্যাটারি—এই একাধিক উৎসের সমন্বয়ে কারখানার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সংকটের মধ্যেও মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ধরে রাখতে পারছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রযুক্তি বদলেছে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব
শুধু উৎপাদন সচল রাখাই নয়, লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ ব্যয়ও কমেছে বলে দাবি করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
লিটল স্টার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোরশেদ আলম জানান, জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা জাইকার একটি উপস্থাপনার মাধ্যমে শিল্পকারখানায় এ ধরনের এনার্জি স্টোরেজ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে তারা জানতে পারেন। তবে প্রচলিত প্রযুক্তির ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পরে চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটারি তৈরি করানো হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাটারি স্থাপনে শুরুতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খরচ কমে আসায় সেটি অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হচ্ছে। কারখানাটিতে ব্যবহৃত ব্যবস্থায় প্রচলিত বিদ্যুৎ সরবরাহের তুলনায় ব্যয় প্রায় ১৭ শতাংশ কমেছে। এতে মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে।
অন্য কারখানায় যখন স্থবিরতা
চিত্রশাইল শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় জ্বালানি সংকটের চিত্র যখন স্পষ্ট, তখন লিটল স্টারে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতা। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলেও ব্যাটারি ব্যাকআপের কারণে উৎপাদন লাইন সচল রাখা যাচ্ছে।
স্পিনিং প্রক্রিয়ায় তুলা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে মেশিনের মাধ্যমে সুতা তৈরির কাজ চলছে। তুলা ও রেয়নের মতো উপকরণের মিশ্রণেও তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সুতা। উৎপাদন লাইনে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার থাকায় সুতা ছিঁড়ে গেলে দ্রুত তা পুনরায় সংযুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিভিন্ন কাউন্টের সুতা উৎপাদন করে তা ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে জ্বালানি সংকটের মধ্যেও উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
সংকট মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানিই কি পথ?
দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতে জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতার ওপরও চাপ বাড়তে পারে। উৎপাদন সময়মতো শেষ না হলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
লিটল স্টার স্পিনিং মিলসের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, শিল্পকারখানায় এনার্জি স্টোরেজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্তত বিদ্যুৎ বিভ্রাটজনিত উৎপাদন ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। তবে এ ধরনের প্রযুক্তিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে এটি গ্রহণ করা সহজ নয়।
কারখানা কর্তৃপক্ষের মতে, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট বিবেচনায় শিল্পে বিকল্প বিদ্যুৎ উৎস ও এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো গেলে উৎপাদন ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিদ্যুৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ—দুই ক্ষেত্রেই সুফল পাওয়া যেতে পারে।
জ্বালানি সংকটের এই সময়ে তাই লিটল স্টারের লিথিয়াম ব্যাটারি শুধু একটি বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নয়; বরং শিল্পের উৎপাদন সচল রাখার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজনের একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

