১৯ বছর ধরে লড়াই চালিয়ে অবশেষে হেরে গেলেন রাজধানীর মিরপুরের ‘ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস’ কারখানার মালিক মাহবুবুল হাসান। গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাটি। এতে কাজ হারিয়েছেন ১৭৭ জন শ্রমিকসহ মোট ১৯০ জন কর্মী। ব্যবসায়ের টানা মন্দা, আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট ও স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিকূলতায় বাধ্য হয়েই কারখানাটিতে তালা ঝুলিয়ে দিতে হয়েছে।

পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সদস্য গ্রুপে এক বার্তায় নিজের এই ব্যর্থতা ও সহায় সম্বল হারানোর কথা জানান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহবুবুল হাসান ফয়সাল। তিনি জানান, নানা উপায়ে চেষ্টা করেও প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতে পারেননি। এখন পাওনাদারদের দেনা শোধ করতে বিক্রির জন্য কারখানাটির সুব্যবস্থা খুঁজছেন তিনি।

যেভাবে শুরু হয়েছিল যাত্রা

২০০৬ সালে অংশীদারদের নিয়ে ‘ম্যাট্রিক্স স্টাইল’ নামে মিরপুরে সাব-কনট্রাক্টিং ব্যবসা দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন মাহবুবুল হাসান। তবে অংশীদারদের সাথে বনিবনা না হওয়ায় সেই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপর ২০০৯ সালে আগের ব্যবসার সঞ্চিত ২৬ লাখ টাকা দিয়ে চালু করেন ‘ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস’। শুরুর দিকে অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে পোশাক রপ্তানি করতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাঁকে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে মিরপুরের রূপনগরে ভাড়া শেডে কারখানা সরিয়ে লাইসেন্স সংগ্রহ করে সরাসরি রপ্তানি শুরু করেন।

সাফল্য ও ধ্বংসের মুখে পতন

রানা প্লাজা ধসের পর কারখানা ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত হলে ২০২২ সালের শেষের দিকে এটি মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকার একটি ভাড়া শেডে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ব্যবসার সেরা সময় কাটে প্রতিষ্ঠানটির। ২০২৩ সালে প্রায় ৪১ লাখ ডলার (৪৪ কোটি টাকার বেশি) মূল্যের পোশাক রপ্তানি করে তারা। পোল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও অস্ট্রিয়ার মতো ইউরোপের ১০-১১টি নামী ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পোশাক নিত এই কারখানা থেকে।

তবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা করার পর থেকেই সংকট ঘনীভূত হতে থাকে। উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়লেও বিদেশি ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি হয়নি।

ক্রয়াদেশ না থাকায় ২০২৪ সালে রপ্তানি কমে দাঁড়ায় সাড়ে ২০ লাখ ডলারে এবং গত বছর তা আরও নেমে মাত্র ১৭ লাখ ডলারে ঠেকে। বিগত ৭-৮ মাস সাব-কনট্রাক্টিংয়ের কাজ চালিয়েও কারখানার খরচ উঠছিল না। বকেয়া পড়ে ৯ মাসের ভবন ভাড়া। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজের বসত ফ্ল্যাট বন্ধক রেখেও শেষ রক্ষা হয়নি।

উদ্যোক্তা মাহবুবুল হাসান আক্ষেপ করে বলেন, তিল তিল করে ১৯ বছর ধরে গড়ে তোলা ব্যবসা তাকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে দিয়েছে। এখন তার একমাত্র চেষ্টা, কারখানাটি যেন কোনো নতুন মালিকের হাত ধরে আবার বেঁচে থাকে এবং তিনি তা বিক্রি করে সমস্ত পাওনা মিটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com