‘ইউরোপ-আমেরিকার বাইরে মালয়েশিয়া আমাদের পোশাক খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার’প্রকৌশলী মো. শাহমিজ বকুলের বিশেষ সাক্ষাৎকারবাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প বিশ্ববাজারে রফতানির দিক থেকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে একক বা প্রথাগত বাজারগুলোর ওপর অতি-নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি।

এই উন্নয়ন ও নতুন বাজার সম্প্রসারণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন প্রকৌশলী মো. শাহমিজ বকুল। তিনি বর্তমানে বিজিএমইএ-এর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংক্রান্ত কমিটির চেয়ারম্যান এবং বিউমন্ড টেক্স লিমিটেড ও বি এ ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

অপ্রচলিত বাজার হিসেবে মালয়েশিয়ার সম্ভাবনা, রফতানি কৌশল ও ভবিষ্যতের পোশাক খাত নিয়ে সাক্ষাৎকারের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।

প্রশ্ন: বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ইউরোপ ও আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে অপ্রচলিত বাজার হিসেবে মালয়েশিয়াকে কেন এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?

প্রকৌশলী মো. শাহমিজ বকুল: ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা বাজারগুলোতে প্রায়শই অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা যায়, যার ফলে রফতানিতে ঝুঁকি থেকে যায়। তাই রফতানি বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। মালয়েশিয়া আমাদের জন্য একটি উচ্চ সম্ভাবনাময় অপ্রচলিত বাজার।

এর অন্যতম কৌশলগত কারণ হলো ভৌগোলিক নৈকট্য—যার ফলে শিপিং সময় ও পরিবহন খরচ অনেকটাই কমে যায়। পাশাপাশি, মালয়েশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল আশিয়ান (ASEAN) আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়া আমাদের জন্য সহজ হবে।

প্রশ্ন: মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ পোশাক খাতের বর্তমান চিত্র ও প্রবৃদ্ধি কেমন দেখছেন?

প্রকৌশলী মো. শাহমিজ বকুল: মালয়েশিয়া এক্সটার্নাল ট্রেড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (ম্যাট্রেড) তথ্য লক্ষ্য করলে দেখবেন, ২০২৫ সালে দেশটির পোশাক ও আনুষঙ্গিক খাতের মোট বাণিজ্য পৌঁছেছে ১৮.২৪ বিলিয়ন রিঙ্গিতে, যা আগের বছরের চেয়ে ৮.৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে তাদের রফতানি ছিল ৬.৮৮ বিলিয়ন রিঙ্গিত।২০২৬ সালেও এই ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে।

বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই পোশাক সামগ্রী রফতানি ২৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মালয়েশিয়ায় তৈরি পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে, যা আমাদের মতো রফতানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

প্রশ্ন: এই বাজারে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান তৈরিতে বিজিএমইএ ও উদ্যোক্তারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

প্রকৌশলী মো. শাহমিজ বকুল: বিজিএমইএ এবং বিএমসিসিআই-এর মতো বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থাগুলো অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। আমরা একক দেশের বাণিজ্য মেলা, ‘এটেক্স মালয়েশিয়া’র মতো আঞ্চলিক টেক্সটাইল এক্সপো এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বাজার দখলের চেষ্টা করছি।

শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ার বাজারে স্থানীয়ভাবে আগ্রাসী ব্র্যান্ডিং এবং সরাসরি খুচরা বিক্রয় (Retail) নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।এমনকি আসন্ন মেগা ‘বাংলাদেশ এক্সপোজিশন’-এ কেবল পোশাক বা নিটওয়্যার নয়, বাংলাদেশের পর্যটন, সফটওয়্যার, ব্যাংকিং, হোটেল ও এয়ারলাইন্স খাতকে সমন্বিতভাবে তুলে ধরা হবে—যাতে দেশের সার্বিক ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী হয়।

প্রশ্ন: মালয়েশিয়ার বাজারে আমাদের কোন কোন নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির পোশাকে নজর দেওয়া উচিত?

প্রকৌশলী মো. শাহমিজ বকুল: আমাদের প্রধানত চারটি ক্যাটাগরির ওপর জোর দিতে হবে:

১. শালীন পোশাক (Modest Fashion): দেশটির বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে আধুনিক ও প্রিমিয়াম মানের শালীন পোশাক।

২. অ্যাথলেইজার ওয়্যার (Athleisure Wear): স্পোর্টস ও ফিটনেস পোশাকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে মানসম্মত পারফর্মেন্স ফ্যাব্রিকের পোশাক।

৩. টেকসই/সবুজ পোশাক (Sustainable Garments): পরিবেশসচেতন শহুরে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে সার্টিফাইড অর্গানিক বা রিসাইকেল করা কাপড়ের তৈরি পণ্য।

৪. ইউনিফর্ম ও ওয়ার্কওয়্যার (Uniforms & Workwear): কর্পোরেট এবং শিল্প খাতের জন্য বিশেষায়িত পোশাক তৈরি ও সরবরাহ।

প্রশ্ন: ২০২৬ থেকে ২০৩৫ মেয়াদে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে বলে মনে করেন?

প্রকৌশলী মো. শাহমিজ বকুল: আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকিয়ে রাখার মূল নির্ধারক হবে ‘টেকসইতা’ (Sustainability)। বাংলাদেশকে কেবল ‘কম খরচে পণ্য সরবরাহকারী’র তকমা থেকে বেরিয়ে এসে একটি ‘টেকসই ও উদ্ভাবনী কেন্দ্র’ হিসেবে রূপান্তরিত হতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক সংযোজন, পরিবেশবান্ধব সবুজ বিনিয়োগ এবং পণ্যের বৈচিত্র্য সুনিশ্চিত করতে পারলেই ২০৩৫ সালের মধ্যে আমরা বিশ্ববাজারে নিজেদের শীর্ষ অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারব।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com