বিশেষ সমীক্ষা: দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে চার মিলিয়নেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত এবং মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এই খাত থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার বা বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে হুট করে কোনো পরিবর্তন এলে তার পুরো প্রভাব সরাসরি পড়ে দেশের অর্থনীতির ওপর। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আকস্মিক বড় কোনো সংকট বা বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের পোশাকখাত এখনো আশানুরূপ প্রস্তুতি নিতে পারেনি।

চলতি বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন এক তরফাভাবে ৩৭ শতাংশ ‘পারস্পরিক’ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। আগে এই শুল্কের গড় হার ছিল ১৫.৭ শতাংশ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ একা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেই যায়। ফলে এই সিদ্ধান্তটি ছিল দেশের পোশাক খাতের জন্য এক বিরাট বড় পরীক্ষা—এমন ধাক্কা সামলে ওঠার সক্ষমতা কারখানাগুলোর কতটুকু আছে, তা যাচাই করার।

গবেষণার তথ্য বলছে, এই আকস্মিক পরিবর্তন দ্রুত সামলে নেওয়ার মতো প্রস্তুতি খাতটিতে অনুপস্থিত। কলম্বিয়া বিজনেস স্কুল ও ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদদের এক যৌথ জরিপে এ চিত্রে উঠে এসেছে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন পোশাক কারখানার ১,১৪৬ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, ১,৩০৪ জন এইচআর ম্যানেজার এবং ২,৮৪৯ জন শ্রমিকের মতামত নিয়ে ২০২৫ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর সময়ে এই গবেষণা চালানো হয়।

তথ্য পৌঁছাতে বিলম্ব ও সঠিক ধারের অভাব

জরিপে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব চরম পর্যায়ে। কারখানাগুলো কোন দেশের জন্য পোশাক তৈরি করছে, তা জানতেন না ৮০ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক। এমনকি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে—এমন কারখানার শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও মাত্র ৩০ শতাংশ এই শুল্ক বৃদ্ধি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মস্থলের বৈশ্বিক ঝুঁকি সম্পর্কে না জানলে শ্রমিকরা আগে থেকে বাড়তি সঞ্চয় বা বিকল্প কর্মসংস্থানের মতো কোনো পূর্বপ্রস্তুতি নিতে পারেন না।

একইভাবে, কারখানার ব্যবস্থাপকদের (ম্যানেজারদের) কাছেও বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের খবর পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ ম্যানেজার নীতি পরিবর্তনের দুই মাসেরও বেশি সময় পর (জুন মাস বা তার পরে) বিষয়টির খবর পান। মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর ভর করেই বেশিরভাগ ম্যানেজার এ সংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্য জানতে পেরেছিলেন।

অনিশ্চয়তায় ভুগছেন কারখানার মালিক ও শ্রমিকরা

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি বারবার পরিবর্তিত হওয়ার কারণে সার্বিক তথ্যেও এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। ৩৭ শতাংশ প্রস্তাব দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা কিছুদিন স্থগিত, এরপর কমিয়ে ৩৫ শতাংশ এবং অবশেষে সমঝোতার মাধ্যমে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই কাঠামোর ফলে কারখানার নীতি-নির্ধারকরাও নিশ্চিত হতে পারেননি আদতে শুল্ক বাড়ছে নাকি কমছে।

এই অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে বিদেশি ক্রেতারা ততক্ষণে নিজস্ব কৌশল বদলে ফেলেছেন। দেখা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা রয়েছে এমন পোশাক কারখানাগুলোর ২৮ শতাংশই কোনো না কোনো আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছ থেকে ক্রয়াদেশ বাতিল, পণ্য মূল্য কমানো কিংবা তাড়াহুড়ো করে ডেলিভারি পাওয়ার মতো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।

গবেষণায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, পোশাক খাতের এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে দ্রুত ও সঠিক তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র মতো বাণিজ্য সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে কার্যকর ও অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে হলে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতকেও সমৃদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com