ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং জটিলতা ও পরিবহন সংকটের কারণে রাশিয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে। একসময় যে সম্ভাবনাময় বাজারে বছরে এক বিলিয়ন ডলার অর্জনের লক্ষ্য ছিল, সেখানে এখন অর্থ না পাওয়ার ঝুঁকি ও বাড়তি খরচের কারণে লেনদেন থমকে গেছে।
বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় পাঠানো পণ্যের সিংহভাগই তৈরি পোশাক। ২০১১ সালে তুরস্ক বাংলাদেশি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করার পর স্থানীয় রপ্তানিকারকেরা সরাসরি রাশিয়ার উদীয়মান বাজারে মনোযোগী হন। কিন্তু ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পূর্বে ২০২০-২১ অর্থবছরে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৬৬৫.৩১ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৬৩৮.৩০ মিলিয়ন ডলারে। তবে এর পর থেকে ক্রমাগত কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ২৫৭.২৬ ডলারে নেমে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, যুদ্ধের পর রাশিয়ার একাধিক ব্যাংককে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ‘সুইফট’ (SWIFT) থেকে বাদ দেওয়ায় বকেয়া বিল আদায় করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, সুইফট জটিলতায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের রাশিয়ার কাছে বড় অঙ্কের অর্থ আটকে আছে। বিশেষ করে অনেক ছোট ও মাঝারি নিট পোশাক রপ্তানিকারক তিন থেকে চার মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পাওনা এখনো বুঝে পাননি।
এর বাইরে সরাসরি পণ্য পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় রপ্তানিকারকদের পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, বেলারুশ কিংবা জার্মানির মতো তৃতীয় দেশকে বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ ও জটিলতা দুই-ই বেড়েছে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইয়াংফোরএভার টেক্সটাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিব চৌধুরী জানান, রাশিয়ায় যুদ্ধের আগে তিনি বছরে এক মিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য পাঠাতেন। কিন্তু এক লাখ ডলার পাওনা পেতে দীর্ঘ তিন বছর সময় লাগা ও নানামুখী ঝক্কি পোহানোর পর তিনি আপাতত দেশটিতে রপ্তানি স্থগিত করেছেন।
ঝুঁকি এড়াতে অনেক ব্যবসায়ী তৃতীয় দেশের মুদ্রা (যেমন চীনা ইউয়ান বা তুর্কি লিরা) এবং বিকল্প উপায়ে অর্থ লেনদেনের চেষ্টা করছেন। তবে এতে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও রাশিয়ার বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বলে মনে করেন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি জানান, বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীরা বর্তমানে জাপান, তুরস্ক, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অপ্রচলিত বাজারে নজর বাড়াচ্ছেন। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটলে রাশিয়া আবারও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য হয়ে উঠবে।


