বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট এখন দেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সংযোগ ও স্থিতিশীল সরবরাহ না থাকায় হাজার হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ অচল হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের স্পিনিং, উইভিং, ডাইং ও অন্যান্য প্রাথমিক টেক্সটাইল খাতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিভিন্ন শিল্প প্রকল্পে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ বর্তমানে গ্যাস সংযোগের অভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না। এতে দেশের শিল্প সম্প্রসারণ ও উৎপাদন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (BTMA) জানায়, স্থানীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলো দেশের নিটওয়্যার শিল্পের প্রায় পুরো সুতা চাহিদা এবং বোনা কাপড়ের বড় অংশ সরবরাহ করে থাকে।
তবে গ্যাসের স্বল্পতা ও নিম্নচাপের কারণে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার ও ময়মনসিংহসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা বর্তমানে সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন এক বিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি শিল্প উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
শিল্প মালিকরা বলছেন, আধুনিক স্পিনিং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য বিদ্যুৎ বিভ্রাটও সুতা উৎপাদনে সমস্যা সৃষ্টি করে, মেশিনের কার্যক্ষমতা কমায় এবং কাঁচামালের অপচয় বাড়ায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ টেক্সটাইল কারখানা নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে গ্যাসভিত্তিক ক্যাপটিভ পাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমানে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সেই ব্যবস্থাও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা গেলেও এতে উৎপাদন ব্যয় দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।
এতে স্পিনিং, ডাইং, উইভিং ও অন্যান্য শক্তিনির্ভর শিল্পগুলো আর্থিক চাপে পড়ছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ১ হাজার ৮০০টির বেশি শিল্প গ্যাস সংযোগ আবেদন ঝুলে রয়েছে। এছাড়া প্রায় ৫৫০টি কারখানা চার থেকে পাঁচ বছর ধরে সংযোগের অপেক্ষায় আছে, যদিও তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ফি পরিশোধ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। কারণ দেশীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্প দুর্বল হয়ে পড়লে রপ্তানিকারকদের বিদেশ থেকে সুতা ও কাপড় আমদানির ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। এতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমে যাবে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত গ্যাস অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন জ্বালানি উৎস নিশ্চিতকরণ এবং শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।


