“প্রতিশ্রুতি নয়, রোডম্যাপ — চলুন একসাথে এগিয়ে যাই” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আইটিইটি এর আসন্ন ১৫তম কাউন্সিল নির্বাচনে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরাম (TEF) মনোনীত ‘এনায়েত-সুমায়েল-নিক্সন’ প্যানেল এই ইশতেহার প্রকাশ করেছে।
আগামী ২৬ জুন ২০২৬ তারিখে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্যানেলটিতে সভাপতি পদে ইঞ্জি. মো. এনায়েত হোসেন (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিট এম্পায়ার লি.), সহ-সভাপতি পদে ইঞ্জি. সুমায়েল মোহাম্মদ মল্লিক (হেড অব অপারেশনস, আনলিমা ইয়ার্ন ডাইং) এবং মহাসচিব পদে ইঞ্জি. এ.এস.এম. হাফিজুর রহমান (নিক্সন) (নির্বাহী পরিচালক, আরএইচ কর্পোরেশন) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেনএই বাস্তবতার পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে দ্য ইনস্টিটিউশন অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড টেকনোলজিস্টস (আইটিইটি)-এর ১৫তম কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরাম (টিইএফ) সমর্থিত ‘এনায়েত-সুমায়েল-নিক্সন’ প্যানেল।
তাদের ইশতেহার মতে, দেশের বৃহত্তম শিল্পখাত পরিচালনা করলেও টেক্সটাইল প্রকৌশলীরা কার্যত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত।
প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে—
• স্বতন্ত্র সরকারি ক্যারিয়ার কাঠামোর অভাব
• চাকরির নিরাপত্তাহীনতা
• পেশাগত স্বীকৃতির সংকট
• বেসরকারি খাতে অবসরকালীন সুবিধার অনুপস্থিতি
• জাতীয় নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা
• তরুণ প্রকৌশলীদের মধ্যে আইটিইটির প্রতি অনাগ্রহ
প্যানেলের দাবি, আইটিইটিকে শক্তিশালী না করলে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
আইইবি ও বিএমএ মডেলে আইটিইটি
ইশতেহারের সবচেয়ে বড় নীতিগত ঘোষণা হলো আইটিইটিকে ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি) এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর মতো একটি প্রভাবশালী পেশাগত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।
লক্ষ্য হলো এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে—
• আইটিইটির সার্টিফিকেশন শিল্পে মূল্য পাবে
• সরকারি নীতিনির্ধারণে আইটিইটির মতামত বাধ্যতামূলক হবে
• গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে পেশাগত স্বীকৃতি গুরুত্ব পাবে
• টেক্সটাইল প্রকৌশলীদের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি ক্যারিয়ার পথ তৈরি হবে
বাস্তবায়নের তিন ভিত্তি
ইশতেহারে উল্লেখিত সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য তিনটি মূল ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথমত, সদস্যদের মধ্যে ঐক্য ও ডিজিটাল সংযোগ। এজন্য আইটিইটি মোবাইল অ্যাপ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, অনলাইন ফোরাম, ইমেইল ডাইজেস্ট এবং লাইভস্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বুটেক্স, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, বিডা, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব।তৃতীয়ত, পূর্ণকালীন প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, যেখানে সিওও, ডিভিশনাল প্রধান, আঞ্চলিক সমন্বয়ক এবং আন্তর্জাতিক উইং থাকবে।
দুই বছরের ১১ দফা কর্মপরিকল্পনা
বিসিএস টেক্সটাইল ক্যাডার
ইশতেহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হলো ২০০টি পদ নিয়ে বিসিএস টেক্সটাইল ক্যাডার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করা।
এর পাশাপাশি বস্ত্র অধিদপ্তরের শূন্য উচ্চপদগুলোতে টেক্সটাইল প্রকৌশলীদের পদোন্নতি এবং মহাপরিচালক পদে টেক্সটাইল প্রকৌশলী নিয়োগের দাবিও জানানো হয়েছে।
আইটিইটি ভবন
উত্তরার ১০ কাঠা জমিতে আইটিইটির স্থায়ী ভবনের অন্তত দুইতলা নির্মাণ আগামী মেয়াদের মধ্যেই সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি ভবিষ্যতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
পেশাগত সার্টিফিকেশন
প্রস্তাবিত তিন স্তরের সার্টিফিকেশন কাঠামো—
• Registered Textile Engineer (RTE)
• Chartered Textile Engineer (CTE)
• Fellow of ITET (FITET)
প্যানেলের দাবি, ভবিষ্যতে CTE সার্টিফিকেশন সিনিয়র পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হবে।
চাকরি, বেতন ও আইনি সুরক্ষা
ইশতেহারে চাকরিকে অন্যতম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—
• আইটিইটি জবস পোর্টাল
• বছরে ১ হাজারের বেশি চাকরির সুযোগ প্রকাশ
• জব ফেয়ার
• বেতন কাঠামো জরিপ
• আইনি সহায়তা তহবিল
• চাকরিচ্যুতি বা বেতন সংক্রান্ত বিরোধে সহায়তা
সামাজিক নিরাপত্তা
প্যানেলটি আইটিইটি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
এখানে থাকবে—
• গ্রুপ লাইফ ও স্বাস্থ্য বীমা
• জরুরি চিকিৎসা সহায়তা
• হাসপাতাল পার্টনারশিপ
• মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
• পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি
• শিশুদের বৃত্তি
• বিধবা ও এতিম সহায়তা
গবেষণা ও উদ্ভাবন
গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে—
• বাংলাদেশ ন্যাশনাল টেক্সটাইল রিসার্চ সেন্টার
• আইটিইটি ইনোভেশন গ্রান্ট
• আন্তর্জাতিক জার্নাল
• গবেষণা সম্মেলন
• টেক্সটাইল ইনোভেশন সেল
গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তরুণ প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা
নতুন সদস্যদের জন্য ৫০ শতাংশ ফি ছাড়, মেন্টরশিপ, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং বুটেক্স শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
আইটিইটি প্রিমিয়ার লীগ, ই-স্পোর্টস, ম্যারাথন, ফ্যামিলি ডে, সাংস্কৃতিক উৎসব এবং ওয়েলনেস প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গ্লোবাল আউটরিচ
দেশীয় ট্রেড বডির পাশাপাশি AATCC, SDC, ITMA-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বিদেশে প্রশিক্ষণ, ট্রেড মিশন এবং আন্তর্জাতিক অধ্যায় গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
সাংবিধানিক সংস্কার
আইটিইটিকে ১০টি বিশেষায়িত টেকনিক্যাল ডিভিশনে ভাগ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্পিনিং, উইভিং, নিটিং, ওয়েট প্রসেসিং, অ্যাপারেল, টেস্টিং, গবেষণা, সাসটেইনেবিলিটি, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং মেশিনারি—প্রতিটি খাতের জন্য পৃথক কাঠামো থাকবে।
সদস্যসংখ্যা ৫০০ অতিক্রম করলে আঞ্চলিক সাব-সেন্টার গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিদেশি টেকনিশিয়ান নীতি
ইশতেহারের সবচেয়ে আলোচিত নতুন সংযোজন হলো বিদেশি টেকনিশিয়ান ব্যবস্থাপনা।
প্যানেল প্রস্তাব করেছে—
• জাতীয় বিদেশি টেকনিশিয়ান ডাটাবেজ
• বাধ্যতামূলক নিবন্ধন
• জ্ঞান হস্তান্তর কর্মসূচি
• বিদেশি নিয়োগে সীমাবদ্ধতা
• দেশীয় প্রকৌশলীদের দক্ষতা উন্নয়ন
• বিদেশি নির্ভরতা ২৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য
প্যানেলের দাবি, এর ফলে দেশীয় প্রকৌশলীদের বেতন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ভিশন ২০৩৫
দীর্ঘমেয়াদে প্যানেলটি আইটিইটিকে একটি স্বীকৃত অ্যাক্রেডিটেশন অথরিটি, জাতীয় থিংক-ট্যাংক এবং আন্তর্জাতিক দক্ষতা কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চায়।
ভিশনের মধ্যে রয়েছে—
• মাল্টিস্টোরিড কনভেনশন সেন্টার
• মেডিকেল সেন্টার
• ইঞ্জিনিয়ার্স হাউজিং প্রকল্প
• ন্যাশনাল টেক্সটাইল লিডারশিপ একাডেমি
• আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব
• বি-টু-বি হাব
• টেক্সটাইল গবেষণা ও উদ্ভাবন অবকাঠামো
এছাড়া ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার জন্য নীতিগত সহায়তার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থায়ন ও জবাবদিহিতা
ইশতেহারের একটি ব্যতিক্রমী দিক হলো অর্থায়নের উৎস এবং জবাবদিহিতা কাঠামো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা।
অর্থায়নের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—
• পিপিপি
• আন্তর্জাতিক অনুদান
• আইটিইটির সম্পদ
• সদস্য ও সার্টিফিকেশন ফি
• সরকারি সহায়তা
একইসঙ্গে প্রতি তিন মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদন, ছয় মাস অন্তর টাউন হল, এক বছর পর স্বাধীন মূল্যায়ন এবং সদস্যদের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।


