বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। একটি প্রভাবশালী চক্র বায়িং হাউসের আড়ালে কোটি কোটি ডলার বিদেশে পাচার করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে গাজীপুর ও সাভারের অন্তত ১৫টি পোশাক কারখানা মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, তাদের মোট বকেয়া প্রায় ২০ লাখ ডলার।
এই চক্রের সঙ্গে জড়িত হিসেবে উঠে এসেছে জেনেক্স ইনফোসিসের সাবেক চেয়ারম্যান আদনান ইমামের নাম। তার সঙ্গে দুই বিদেশি নাগরিক—মনিষ চৌহান ও অনুরাগ চৌহান—সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা ২০১৮ সালে ‘নয়েজ জিন্স লিমিটেড’ নামের একটি বায়িং হাউসের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে।
শুরুতে নিয়মিত অর্ডার ও সময়মতো অর্থ পরিশোধ করে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আস্থা অর্জন করে চক্রটি। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই অর্থ পরিশোধে গড়িমসি শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানি সম্পন্ন হলেও কারখানাগুলো তাদের পাওনা টাকা পায়নি।
সাধারণ নিয়মে চুক্তির ভিত্তিতে কারখানাগুলো এলসি খুলে কাঁচামাল সংগ্রহ করে উৎপাদন সম্পন্ন করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, নয়েজ জিন্স কর্তৃপক্ষ শিপমেন্টের পর ব্যাংকের মাধ্যমে ডকুমেন্ট পাঠানোর পরিবর্তে সরাসরি তাদের অফিসে জমা দিতে বাধ্য করত। এরপর সেই নথি ব্যবহার করে বিদেশে পণ্য ছাড় করানো হলেও অর্থ পরিশোধ করা হতো না।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ দেনা রেখে চক্রের সদস্যরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এতে অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
এদিকে তদন্তকারীরা জানান, বর্তমানে এই চক্র ‘লাভজেন’ নামে দুবাই, হংকং ও ভারতে সক্রিয় রয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে তারা এখনও বাংলাদেশি কারখানাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক পরিচালক বলেন, এই চক্র শুধু পোশাক খাত নয়, ব্যাংক ও পুঁজিবাজারেও অনিয়ম করেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও উদ্যোক্তা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের একজন জানান, দীর্ঘদিন ধরে লাখ ডলার বকেয়া না পেয়ে তিনি তার কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। অন্য আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, পাওনা না পেয়ে তিনি নতুন এলসি খুলতে পারছেন না এবং এখন সাব-কন্ট্রাক্টিং করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সদস্যরা বর্তমানে যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড ও স্পেনে অবস্থান করছে। তারা বিভিন্ন দেশে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করছে, যা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পাচার করা অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল সম্পদ কেনা হয়েছে। নিউইয়র্ক ও দুবাইয়ে কোটি ডলারের সম্পত্তি কেনার তথ্যও সামনে এসেছে।
এছাড়া ব্যাংক খাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে একটি ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নিয়ে তা খেলাপি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত চাওয়া হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে এবং প্রয়োজন হলে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

