বুটেক্স প্রতিনিধি বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার এন্ট্রি ফর্ম পূরণের সময় আসলেই যেন শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির আর শেষ থাকে না। যেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ফর্ম পূরণের সুবিধা পাচ্ছেন সেখানে ২০২৬ সালে এসেও বুটেক্সের শিক্ষার্থীরা হাতে লিখেই পরীক্ষার এন্ট্রি ফরম পূরণ করছেন। অন্যদিকে স্বল্প সময়ের নোটিশে ভর্তি ও পরীক্ষার ফি আদায়, সমন্বয়হীন ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল সেবার অভাবে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
যদিও বুটেক্সে চলমান প্রায় পাঁচ কোটি টাকার অটোমেশন প্রকল্পে অনলাইনে ফর্ম পূরণের সুবিধা রয়েছে তবে দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও এই অটোমেশন প্রকল্প আজও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে সেমিস্টারের শেষের দিকে এসে ল্যাব ফাইনাল ও ক্লাস টেস্টের চাপের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের হাতে লিখে এন্ট্রি ফরম পূরণ করতে হচ্ছে, যা অনেক সময় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একাধিক ব্যাচের ফরম পূরণের কার্যক্রম একই দিনে চলায় বুটেক্সের এবং এর আশেপাশের স্টেশনারি দোকানগুলোতে ফরম প্রিন্ট করাতে দীর্ঘ ভিড় তৈরি হয়। এতে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানসিক চাপও বেড়ে যায়।
এ ছাড়া অনাবাসিক শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও হল ক্লিয়ারেন্সের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতিটি হলে আলাদাভাবে যেতে হয়, যা আরও জটিলতা তৈরি করে। প্রযুক্তিনির্ভর সময়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার ফর্ম পূরণের মতন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়ায় প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে দিন দিন হতশা জন্ম নিচ্ছে।
৪৮ তম ব্যাচের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী শোয়েব আল জান্নাত বলেন ,” বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, অদূরদর্শিতা এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে অনীহার কারণে বুটেক্স দীর্ঘদিন ধরে অটোমেশন প্রকল্প বাস্তবায়নহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অটোমেশন ব্যবস্থা না থাকায় ফরম ফিলাপ, হল ও লাইব্রেরি ক্লিয়ারেন্স এবং হাতে লিখে ফরম পূরণের মতো কাজে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে সেমিস্টারের শেষ সময়ে সিটি , ল্যাব ভাইভা ও ফরম ফিলাপ একসঙ্গে পড়লে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। আমি দ্রুত সময়ে অটোমেশন প্রকল্প চালু করে শিক্ষার্থীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনকে আহ্বান জানাই।”
প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দীর্ঘসূত্রতায় যখন বুটেক্সের অটোমেশন থমকে আছে, তখন নিজেদের সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরাই। অনেক শিক্ষার্থী এখন হাতে লেখা ফরমের সাধারণ তথ্যগুলো প্রিন্ট করে বাকি অংশ হাতে পূরণ করছেন। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তারেক আল ইমরান নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছেন একটি স্বয়ংক্রিয় ফরম পূরণ সিস্টেম , যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে খুব সহজেই OBE Curriculumn-এর অন্তর্ভুক্ত শিক্ষার্থীরা টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার ফর্ম ফিল-আপ করতে পারবে। এই ফর্মটি সাবমিট করার পরে আবেদনপত্র এবং প্রবেশপত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হয়ে যাবে তাছাড়া এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ফর্মে দেয়া তথ্যগুলোও নিরাপদ থাকবে।
তারেক আল ইমরান বলেন, “প্রথম বর্ষের লেভেল-১ টার্ম-১ পরীক্ষার সময় ফরম পূরণ সিস্টেম দেখে সত্যিই অনেক হতাশ হয়েছিলাম। তখন থেকেই মনে হতো অন্তত ফরম পূরণ পদ্ধতিটা যদি অটোমেটেড হতো, তাহলে শিক্ষার্থীদের অনেক ভোগান্তি কমত।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে বিশ্ব যেখানে এআই নিয়ে ভাবছে, সেখানে বুটেক্স এখনো অ্যানালগ সিস্টেমে পড়ে আছে। পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনলাইন সিএস৫০এক্স কোর্স করার সময় একটি সমস্যার সমাধানভিত্তিক প্রজেক্ট তৈরি করতে বলা হয়। তখন বুটেক্সের ফরম পূরণের সমস্যাটাই মাথায় আসে।”
তারেক আল ইমরান তার তৈরি সিস্টেমটি পাইথন, ফ্লাস্ক, এইচটিএমএল-সিএসএস এবং পিডিএফ পার্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করেছেন। এতে শিক্ষার্থীরা সহজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফরম পূরণ করতে পারছে। তথ্য নিরাপত্তার জন্য সংযুক্ত করা হয়নি কোনো ডাটাবেজ। তারেক আরও বলেন, “এটা এখনো পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার না, একটা ডেমো ও হবি প্রজেক্ট। ভবিষ্যতে আরও উন্নত করার পরিকল্পনা আছে। তবে আমি চাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ স্টুডেন্ট পোর্টাল চালু করুক।” তার তৈরি সিস্টেম ব্যবহার করে উপকৃত হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী।
অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অভিষেক চন্দ্র শ্রাবণ বলেন, “আগে ফরমে ভুল হলে কাটাকাটি করতে হতো কিংবা নতুন করে ফরম পূরণ করতে হতো। এখন সেটা লাগছে না। পুরো প্রক্রিয়াটাই অনেক দ্রুত ও সহজ হয়েছে।” শিক্ষার্থীদের মতে, প্রশাসনের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার কারণেই এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিজেদের উদ্যোগে সমস্যার সমাধান খুঁজতে হচ্ছে। ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখানো হলেও বাস্তবে এখনো সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে।

