শিপিং এজেন্ট ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের পরও মিলছে না অর্থ, বন্ধ হয়েছে বহু কারখানাবাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। রপ্তানিকারকদের দাবি, ১৯৯০ সাল থেকে গত ৩৬ বছরে বিদেশে পণ্য পাঠানোর পর প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে ফেরত আসেনি। প্রতি ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ অর্থ ফেরত না আসার পেছনে বিদেশি ক্রেতাদের প্রতারণা, ব্যবসায়িক ব্যর্থতা এবং রপ্তানি ও পণ্য সরবরাহসংক্রান্ত নথিপত্রের জটিলতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ সময়ে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। তবে ৩৬ বছরে মোট কত রপ্তানি আয় দেশে ফেরেনি, তার সমন্বিত ও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বিজিএমইএর সাধারণ তথ্যে পাওয়া যায়নি।
রপ্তানি আয় আটকে থাকার এ সংকট সমাধানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও প্রত্যাশিত প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। তাঁদের দাবি, বিদেশি ক্রেতারা পণ্য বুঝে নেওয়ার পরও অর্থ পরিশোধ না করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রপ্তানিকারকেরা। এ সংকট দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
যেভাবে আটকে যাচ্ছে রপ্তানি আয়সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, রপ্তানি আয়ের অর্থ দেশে না আসার অন্যতম কারণ পণ্য পরিবহন ও ডেলিভারিসংক্রান্ত নথিপত্রের অসংগতি। বিদেশি ক্রেতার অনুরোধে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রপ্তানি চালানে রপ্তানিকারকের ব্যাংকের পরিবর্তে ক্রেতার প্রতিষ্ঠান বা প্রতিনিধির নাম উল্লেখ করা হয়। এতে পণ্য সরবরাহের পর অর্থ দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়।
অন্যদিকে, কিছু বিদেশি ক্রেতা পণ্য বুঝে নেওয়ার পর অর্থ পরিশোধ করেন না। আবার কোনো কোনো ক্রেতা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় রপ্তানিকারকেরা পাওনা আদায়ে সমস্যায় পড়েন। এসব ক্ষেত্রে দেশীয় রপ্তানিকারক, বিদেশি ক্রেতা, শিপিং এজেন্ট ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, পণ্যের মূল্য দেশে ফেরত এসেছে কি না, তা যথাযথভাবে যাচাই না করেই শিপিং এজেন্ট ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা বিদেশি প্রতিনিধিদের কাছে পণ্য সরবরাহ করছেন। তাঁদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি হওয়া পোশাকের প্রায় ৯০ শতাংশের পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা।
তবে শিপিং ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। কন্টিনেন্টাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান ইকবাল চৌধুরী আবির বলেন, গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা এ খাতে বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়েছেন, এতে সন্দেহ নেই। বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং দেশীয় রপ্তানিকারকদের মধ্যে কাজ পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা এ সংকটের অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, রপ্তানিকারকেরা যেসব নথিপত্র দেন, শিপিং এজেন্টরা সাধারণত সেগুলোর ভিত্তিতেই বিদেশি আমদানিকারকের প্রতিনিধির কাছে পণ্যভর্তি কনটেইনার হস্তান্তর করেন। নথিতে ব্যাংকের পরিবর্তে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নাম থাকলে অর্থ পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, বিষয়টি মূলত আমদানি-রপ্তানিকারকদের মধ্যকার চুক্তি ও শর্তের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
কারখানা বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা
রপ্তানি আয় আটকে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের ওপর। ব্যবসায়ীদের দাবি, একসময় দেশে প্রায় ৬ হাজার পোশাক কারখানা থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ২ হাজার ৬০০টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থ ফেরত না পাওয়া এ সংকটের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তাঁরা।
চট্টগ্রামের মেসার্স আরাফাত ফ্যাশন গার্মেন্টস লিমিটেডের মালিক এ এম মাহবুব চৌধুরী জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান ৪ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেও ২৫ বছর ধরে অর্থ ফেরত পায়নি। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। আদালতে মামলা করেও কোনো সমাধান না পাওয়ায় ২০০২ সালে কারখানাটি বন্ধ করে দিতে হয় তাঁকে।
মাহবুব চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর চট্টগ্রাম সফরে এলে তিনি বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করে প্রতিকার চেয়েছেন।একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে ২০০২ সালে চারটি কারখানা বন্ধ করে দেয় ট্রেডকম গার্মেন্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪ লাখ ৯৮ হাজার ডলারের রপ্তানি আয় আটকে যায়, যা তৎকালীন বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় সোয়া ৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ম্যালো ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর পরিচালক সাইফ উল্লাহ মনসুর জানান, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ান লাইন শিপিংয়ের মাধ্যমে পাঁচ কনটেইনার বয়েজ কার্গো শর্টস পাঠিয়েও প্রায় ৪ লাখ ডলার ফেরত পাননি তিনি।তাঁর অভিযোগ, ব্যাংকসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি ছাড়াই পণ্য সরবরাহ করায় অর্থ ফেরত আনার জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করার পর হাইকোর্টে তা স্থগিত করা হয়। পরে শিপিং কোম্পানিটি তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে সিআইডির তদন্তে প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানান এ উদ্যোক্তা।
১০০ মামলা, তবু মিলছে না সমাধান
রপ্তানি আয় আদায়ের জন্য পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা প্রায় ১০০টি মামলা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে এসব মামলার বিপরীতে শিপিং এজেন্টদের করা রিট পিটিশনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে আছে।বিজিএমইএর আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, রপ্তানি পণ্যের মূল্য দেশে ফেরত না আসার একটি মামলা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির প্রস্তুতি চলছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে বলে তিনি জানান।তাঁর মতে, এ মামলায় রপ্তানিকারকদের পক্ষে সিদ্ধান্ত এলে তা অন্য মামলাগুলোর নিষ্পত্তিতে দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
এদিকে, ২০০৩ সালেও একই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছিল বিজিএমইএ। সে সময় সংগঠনটির তৎকালীন সহসভাপতি ও বর্তমান বিএনপির সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চিঠি দিয়ে প্রতিকার চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন বাণিজ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি, দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি।
সরকারের কাছে নতুন করে দাবি
রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনার বিষয়ে নতুন করে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। গত ১২ সেপ্টেম্বর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে চিঠি দেন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান। চিঠিতে রপ্তানি খাতের বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
এর দুই দিন পর, ১৪ সেপ্টেম্বর, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহসভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হারুন অর রশিদের কাছে চিঠি পাঠান। সেখানে রপ্তানি পণ্যের মূল্য দেশে না আসার বিষয়টি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে সেলিম রহমান বলেন, শিপিং এজেন্ট ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের মাধ্যমে বিদেশে পণ্য সরবরাহের পর আনুমানিক ৭ বিলিয়ন ডলার পাওয়া যায়নি। তাঁর ধারণা, প্রকৃত অঙ্ক ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। দেশে বহু পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে এ সমস্যারও ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাড়ছে উদ্বেগ
১৯৮০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের বিস্তার ঘটতে থাকে। বর্তমানে এ শিল্পে আনুমানিক ৪০ লাখ শ্রমিক কর্মরত। প্রতিবছর এ খাত থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।এ অবস্থায় রপ্তানি পণ্যের মূল্য সময়মতো দেশে ফেরত না আসা এবং পাওনা আদায়ে দীর্ঘ আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে। তাঁদের মতে, রপ্তানি নথিপত্রে ব্যাংক ও অর্থ পরিশোধের তথ্য নিশ্চিত করা, পণ্য সরবরাহের প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি।
দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা রপ্তানি আয় আদায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে দেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

