তীব্র গ্যাস-সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক কার্যাদেশ কমে যাওয়ার কারণে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প চরম দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত তিন বছরে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে দেশজুড়ে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা ও শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংক ঋণের সুদ কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি জোরদারসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।
গতকাল বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল। বৈঠকে রাষ্ট্রপতির কাছে পোশাক খাতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে সংকট উত্তরণে এসব সুপারিশ হস্তান্তর করা হয়।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের চড়া সুদ এবং নতুন মজুরি কাঠামোর কারণে বিগত তিন বছরে সার্বিক উৎপাদন খরচ ৪০ শতাংশের মতো বেড়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের অভাবে বর্তমানে সিংহভাগ কারখানা তাদের মোট সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা এবং নতুন কার্যাদেশ পাওয়া নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে সরাসরি দেশের রপ্তানি আয়েও। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় কমেছে ১.৬৪ শতাংশ এবং চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ১.৯২ শতাংশ। একই সাথে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়েছে।
এমন নাজুক পরিস্থিতি থেকে শিল্পকে বাঁচাতে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে ছয় দফা সুপারিশ পেশ করা হয়। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, এলএনজি আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে স্বল্প সুদে ঋণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানোর পাশাপাশি পোশাক খাতের জন্য বিশেষ পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং স্কিম চালু এবং গার্মেন্টস ট্রেড ফাইন্যান্স (জিটিএফ) ও ট্রেড ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটিতে তহবিল বাড়ানোর অনুরোধও জানায় সংগঠনটি।
ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে কাস্টমসের বন্ড অডিট প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক করা এবং বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আবার সুতা আমদানির অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এছাড়া পণ্য পরিবহনে গতি আনতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়ন, শাহজালাল বিমানবন্দরে কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়।
সর্বশেষে, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনসহ অন্যান্য প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সাথে এফটিএ, পিটিএ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বিজিএমইএ নেতারা।


