মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাজারে, যার সরাসরি ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় সুতার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এতে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
দেশের অন্যতম শিল্পঘন এলাকা রূপগঞ্জে প্রায় আড়াই হাজার ছোট-বড় টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় সুতা থেকে কাপড় উৎপাদন ও বিপণন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা লাখো শ্রমিক এই খাতে কাজ করেন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, জ্বালানি সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশে সুতার দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরপরই এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
স্থানীয় পাইকারি বাজারগুলোতে প্রতি পাউন্ড সুতার দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, ফলে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প মালিকরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শাহরিয়ার টেক্সটাইলের মালিক তারিকুল ইসলাম শাকিল ভূঁইয়া জানান, আগে যেখানে তার কারখানায় ৭০টি মেশিন চলত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০টিতে। উৎপাদন সীমিত হয়ে এক শিফটে নেমে এসেছে। আগে মাসে প্রায় ১০ টন সুতা ব্যবহার হলেও এখন তা কমে চার টনে নেমেছে। সুতার দাম বাড়ায় প্রতি ১০ টনে অতিরিক্ত ৫-৬ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু ডিজেলের সরবরাহ সংকটের কারণে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে লোকসান কমাতে গিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করতেও বাধ্য হয়েছেন তারা।
বিএম টেক্সটাইলের মালিক বিল্লাল হোসেন জানান, তার কারখানায় আগে ২৪টি মেশিন দিন-রাত চললেও এখন চালু রাখা যাচ্ছে মাত্র ১২টি, তাও সীমিত সময়ের জন্য। সুতার দাম বাড়ায় মাসিক ব্যয় প্রায় এক লাখ টাকা বেড়ে গেছে, যা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় অন্যান্য উদ্যোক্তারাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। রূপা টেক্সটাইল মিলসের মালিক খলিল শিকদার বলেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ী শরীফ আহমেদ লিটন অভিযোগ করেন, বাজারে সুতার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
উদ্যোক্তারা আরও জানান, কাঁচামাল আমদানির খরচ বৃদ্ধি ও ডলারের অস্থিরতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন লোকসানের মুখে পড়ছে এবং দ্রুত সমাধান না হলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, পাইকারি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। কাপড়ের দাম কিছুটা বাড়লেও ক্রেতাদের চাহিদা কমে গেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা আগের দামে বিক্রি করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। গ্রে কাপড় ব্যবসায়ীরাও বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শ্রমিকরা। বিদ্যুৎ সংকট ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় তাদের আয় কমে গেছে। অনেকেই নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না। একজন শ্রমিক জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে তাদের বেতনে।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, এই শিল্পখাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এখন অত্যন্ত জরুরি।

