বৈশ্বিক মূল্যচাপ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কঠোর কমপ্লায়েন্স সামলে যখন দেশের তৈরি পোশাক শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই তীব্র গ্যাস সংকট খাতটিকে নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। কারখানা মালিকদের আশঙ্কা, দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতার কারণে বহু বছরের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক বাজারের একটি বড় অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোর হাতে চলে যেতে পারে।

উৎপাদনে ধস ও অঞ্চলভিত্তিক প্রভাবগ্যাসের চাপের মারাত্মক স্বল্পতায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাক উৎপাদন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, কোনো কোনো কারখানায় যা ৬০ শতাংশ ছুঁয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাজীপুর, সাভার, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের শিল্পকারখানাগুলো। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের ১ হাজারের বেশি রফতানিমুখী কারখানা এবং নিটওয়্যার খাতের স্বাভাবিক উৎপাদন প্রক্রিয়া থমকে গেছে।

সংকটের কেন্দ্রে ডাইং ও ফিনিশিং খাতগ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং প্রক্রিয়ার ওপর, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চচাপের গ্যাস অপরিহার্য। ডাইং কারখানায় অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হলেও বাস্তবে তা নেমে এসেছে ১ থেকে ৩ পিএসআই-তে, যা অনেক সময় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। ফলে বয়লার সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না এবং আধা-প্রস্তুত কাপড়ের স্তূপ জমে পুরো সাপ্লাই চেইন ধীর হয়ে পড়েছে।

গ্যাসের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেল, এলপিজি বা সিএনজির মতো ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম আগে থেকেই নির্ধারিত থাকায় এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরো বোঝা উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।

উদ্বেগে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বিজিএমইএর পদক্ষেপএইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, প্রাইমার্ক, ওয়ালমার্ট, নাইকি, লেভিস, পিভিএইচ, নেক্সট, ম্যাঙ্গো ও টার্গেটের মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বর্তমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট সম্ভব কি না—তা জানতে ক্রেতারা কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও জেনারেটর ব্যবহারের রেকর্ড সংগ্রহ করছেন এবং কমপ্লায়েন্স টিম পাঠিয়ে বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করছেন।পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংগঠন ‘বায়ার্স ফোরাম বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে বিজিএমইএ। বৈঠকে জানানো হয়, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামত শেষে ৮ আগস্টের পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে এবং ১৪ আগস্টের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ অনেকটাই স্বাভাবিক হওয়ার আশা রয়েছে। এই সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে ১ থেকে ২ সপ্তাহ শিপমেন্ট বিলম্বের সুযোগ কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে বিবেচনা করার জন্য বিজিএমইএর পক্ষ থেকে ক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

আস্থা হারানোর ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞ মতবিজিএমইএ নেতৃত্ব ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা। অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ কোনোভাবে সামলে নেওয়া গেলেও সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে না পারলে ক্রেতারা দ্রুত বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মূল শক্তি হলো নির্ধারিত সময়ে মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তাদের সাপ্লাই চেইনে ঝুঁকি কমাতে চায়। কোনো একটি দেশে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া বা পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো সেই সুযোগ নিতে প্রস্তুত।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান ক্রেতারা কেবল কম দাম নয়, বরং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সময়নিষ্ঠ শিপমেন্টকে সমান গুরুত্ব দেন। তাই গ্যাস সংকটকে স্রেফ জ্বালানি সমস্যা হিসেবে না দেখে দেশের রফতানি প্রতিযোগিতা ও বৈশ্বিক সুনামের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান প্রয়োজনশিল্পোদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি মিললেও স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা জরুরি। নতুন ভাসমান ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, গ্যাস সরবরাহ কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার ওপর তারা জোর দিচ্ছেন। দেশের কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও রফতানি আয়ের প্রধান এ ভিত্তি রক্ষা করতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com