Advertisement

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প শুধু একটি রপ্তানি খাত নয়, বরং দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতে কাজ করেন। তাদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী রপ্তানি খাত, যা দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। একই সঙ্গে এই খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-এর প্রায় ১১ শতাংশ যোগান দেয়। শিল্পটির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের আয়, কর এবং এই খাতকে ঘিরে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকার শিক্ষা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।

দীর্ঘ কয়েক দশকের ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশ এক সময়ের বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর তালিকা থেকে বেরিয়ে এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী দেশটি ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ বা এলডিসি তালিকা থেকে বের হওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করেছে।

এই উন্নয়নের পেছনে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মডেল কাজ করেছে। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলো কম মজুরির শ্রমিক সরবরাহ করে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হয়। এর ফলে শিল্পকারখানা তৈরি হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়। মানুষের আয় বাড়লে সরকারের কর আদায়ও বাড়ে। সেই করের অর্থ দিয়ে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করে। ধীরে ধীরে অর্থনীতি উচ্চমূল্যের উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যায়।

পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এই পথ অনুসরণ করে উন্নত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং চীন একই ধরনের শিল্পভিত্তিক উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশও একই পথে এগিয়েছে। বড় জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে এই মডেলকে এখনো সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে দেখা হয়।

তবে নতুন প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), এই উন্নয়ন পথকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এআই সরাসরি পোশাক শ্রমিকদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে এমন নয়। বরং প্রযুক্তির কারণে সেই কারণটিই দুর্বল হয়ে পড়ছে, যার জন্য আগে উন্নত দেশগুলো তাদের কারখানা কম মজুরির দেশে স্থানান্তর করত।

এআইচালিত কাটিং মেশিন, স্বয়ংক্রিয় সেলাই প্রযুক্তি এবং রোবোটিক উৎপাদন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে সস্তা হয়ে যাচ্ছে। ফলে ঢাকার একজন শ্রমিকের মজুরি ও চীনের কোনো শিল্পাঞ্চলে ব্যবহৃত একটি স্বয়ংক্রিয় মেশিনের খরচের পার্থক্য কমে আসছে।

এই পরিস্থিতি তৈরি হলে অনেক কোম্পানির জন্য ভোক্তা বাজারের কাছাকাছি এলাকায় স্বয়ংক্রিয় কারখানা স্থাপন করা বেশি লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। তখন কাঁচামাল দূর দেশে পাঠিয়ে উৎপাদন করে আবার পণ্য ফেরত আনার প্রয়োজন কমে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিবর্তন ঘটলে শুধু শ্রমিকের সংখ্যা কমবে না, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শিল্পভিত্তিক উন্নয়নের প্রচলিত পথও সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।

ফলে বাংলাদেশসহ অনেক দেশের সামনে এখন নতুন প্রশ্ন—এআই ও অটোমেশনের যুগে শিল্পভিত্তিক উন্নয়নের এই মডেল ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর থাকবে।

About The Author

সম্পাদক
ইঞ্জি: আতিকুর রহমান আতিক
Email: Contact@textilemirrorbd.com