ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে আজও আন্দোলনে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাভারের শিল্পাঞ্চলে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকেরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন আন্দোলনকারীরা। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা নগরীর বাসন থানায় হামলার চেষ্টা চালান। থানার ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ আবারও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পরে সেখানে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ জায়গায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বড়বাড়ী এলাকায় একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। সেখানে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে, সাভারেও সকাল থেকে শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হেমায়েতপুর ও ফুলবাড়িয়া এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনরত শ্রমিকেরা। এ সময় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলে আগুন জ্বালিয়ে দেন তারা। পরে পুলিশের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যান চলাচল শুরু হয়।
হেমায়েতপুর ও ফুলবাড়িয়ার পাশাপাশি সাভারের উলাইল এলাকাতেও মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন শ্রমিকেরা। এ সময় আল মুসলিমসহ আশপাশের কয়েকটি পোশাক কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
সকালে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে দুই সাংবাদিক ও এক ক্যামেরাপারসনকে মারধরের ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিরা হলেন স্টার নিউজের জেলা প্রতিনিধি আহমাদ সোহান সিরাজী, একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিনিধি রাইয়ান বিন আমিন এবং ওই টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন মো. উজ্জ্বল হোসেন। এ ছাড়া দুপুর ১২টার দিকে সাভার প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও নিউজ ২৪-এর সাভার প্রতিনিধি নাজমুল হুদা এবং তার ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা ক্যামেরাও ভাঙচুর করা হয়। গুরুতর আহত নাজমুল হুদাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের নরসিংহপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। সকাল ১০টার পর কয়েকটি পয়েন্টে শ্রমিকেরা জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে নরসিংহপুর, জামগড়া ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় থেমে থেমে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
সকালের সংঘর্ষের সময় হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক জড়ো হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ দুই দফায় টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলমের গাড়িতে আগুন দেন। এ সময় ওসি হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সকালে পদ্মার মোড় এলাকায় দুই দিক থেকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক জড়ো হয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে পুলিশ প্রতিরোধ করে। এ সময় আন্দোলনকারীরা সাভার মডেল থানার ওসির গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন এবং হামলায় ওসি গুরুতর আহত হন।
এদিকে, সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে পদ্মার মোড় ও হেমায়েতপুর এলাকার আটটি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। কারখানাগুলো হলো দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ওভেন লিমিটেড, দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ওয়াশ লিমিটেড, সামশ স্টাইলিং ওয়্যার লিমিটেড, রূপকথা অ্যাপারেলস লিমিটেড, পদ্মা ক্যান্স লিমিটেড, ব্যাবিলন ক্যাজুয়াল ওয়্যার লিমিটেড, অবনী নিট ওয়্যার লিমিটেড এবং জিন্স ম্যানুফ্যাকচার লিমিটেড। এ ছাড়া ম্যাক্সকম ইন্টারন্যাশনাল বিডি লিমিটেড ও পাইওনিয়ার অ্যাপারেলস লিমিটেডে কর্মবিরতি চলছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাভারের শিল্পাঞ্চলে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। হেমায়েতপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন।


