বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি পরিচিত নাম হামীম গ্রুপ। পোশাক উৎপাদন থেকে ডেনিম, ওয়াশিং, স্পিনিং ও অন্যান্য পশ্চাৎমুখী সংযোগ—বিভিন্ন পর্যায়ে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিকতায়ও।
সর্বশেষ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে হামীম গ্রুপ প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ আয় বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। দেশীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রপ্তানিতে হামীম গ্রুপ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং সামগ্রিকভাবেও দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের তালিকায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বড় বাজার
হামীম গ্রুপের রপ্তানি বাজারের বড় অংশজুড়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গ্রুপটির মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪৬৪.৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে হামীমের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬.৫ শতাংশ বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বের আরও ৬৩টি দেশে হামীম গ্রুপের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রুপটির ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে H&M, Gap, American Eagle, Old Navy, Kontur ও Levi Strauss-এর মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড।৫৮০ মিলিয়ন থেকে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারহামীম গ্রুপের রপ্তানি আয়ের সাম্প্রতিক যাত্রায় উত্থান-পতন দুটিই দেখা গেছে। ২০২১ সালে গ্রুপটির পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৫৮০ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিবর্তনের কারণে রপ্তানি আয় ওঠানামা করেছে।
২০২১–২২ অর্থবছরে রপ্তানি ৬৬৬.৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও পরবর্তী দুই বছরে তা কমে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে প্রায় ৫৮৬.৭ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।সেখান থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আবার রপ্তানি আয় বেড়ে প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।
উৎপাদনের পেছনে বড় অবকাঠামো
হামীম গ্রুপের রপ্তানি সক্ষমতার পেছনে রয়েছে বড় ধরনের উৎপাদন অবকাঠামো। প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে ২৬টি গার্মেন্ট কারখানা, প্রায় ৩০০টি উৎপাদন লাইন এবং একাধিক ওয়াশিং প্ল্যান্ট। এসব কারখানায় প্রতি মাসে প্রায় ৭ মিলিয়ন পিস পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
শুধু তৈরি পোশাকেই সীমাবদ্ধ না থেকে ডেনিম, সুতা, ফেব্রিক, ওয়াশিং, এমব্রয়ডারি, প্রিন্টিং, প্যাকেজিংসহ সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন পর্যায়ে বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি। ফলে পোশাক উৎপাদনের পাশাপাশি নিজস্ব সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ডেনিমেও বড় বিনিয়োগ
হামীম গ্রুপের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে ডেনিম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠানটি টাঙ্গাইলে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে নতুন ডেনিম কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিল। ওই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল মাসে প্রায় ৫ মিলিয়ন গজ ডেনিম উৎপাদন।
স্পিনিং খাতেও বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব কাঁচামাল ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
এ ধরনের backward linkage বা পশ্চাৎমুখী সংযোগ রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দ্রুত ডেলিভারি, গুণগত মান এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের চাহিদা পূরণে নিজস্ব বা নিয়ন্ত্রিত সরবরাহব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি সক্ষমতা দিতে পারে।
এক বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যরপ্তানি আয়ের বর্তমান অবস্থানকে আরও বড় পর্যায়ে নেওয়ার লক্ষ্যও জানিয়েছে হামীম গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ জানিয়েছেন, গ্রুপটি ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
সর্বশেষ ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় সেই লক্ষ্যের এখনও নিচে থাকলেও ব্যবধান কমানোর পথটি স্পষ্ট—উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখা।
তবে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। ক্রেতাদের মূল্যচাপ, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম, বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তন এবং বাজার বৈচিত্র্যের প্রয়োজন—সব মিলিয়ে সামনে রয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের রপ্তানি মানচিত্রে হামীম
২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৬.৫৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর সম্মিলিত রপ্তানি ছিল প্রায় ৫.২৫ বিলিয়ন ডলার। এই তালিকায় হামীম গ্রুপের প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় দেশীয় মালিকানাধীন বড় রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থানকে তুলে ধরে।চার দশকের বেশি সময় ধরে ব্যবসা করা হামীম গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছিল অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরে। বর্তমানে গার্মেন্ট, ডেনিম ও টেক্সটাইলভিত্তিক বড় উৎপাদন কাঠামো গড়ে তুলে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
তবে সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি পরিস্থিতি, ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদা এবং টেকসই উৎপাদনের চাপ—সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগোতে হবে।
এই বাস্তবতায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের বর্তমান রপ্তানি আয় ধরে রেখে এক বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে পৌঁছানোই হবে হামীম গ্রুপের পরবর্তী বড় পরীক্ষা।


