১৯৬৯ সালে চাঁদে পা রাখা অ্যাপোলো-১১-এর তিন নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং, মাইকেল কলিন্স ও এডউইন অলড্রিন বিশ্বভ্রমণের অংশ হিসেবে ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত সংবর্ধনায় শত শত মানুষের ভিড়ে উপস্থিত ছিলেন চকবাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন। তিনি নিজের দোকানে তৈরি তিনটি শার্ট উপহার দেন ওই তিন মার্কিন নভোচারীকে। কিছুদিন পর নভোচারীদের কাছ থেকে তিনি পান ধন্যবাদ ও প্রশংসাসূচক চিঠি। এই একটি ঘটনাই রিয়াজউদ্দিনের মনে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন বুনে দেয়।
চকবাজার থেকে পথচলার শুরু
১৯৫৮ সালে পারিবারিক টেক্সটাইল ব্যবসায় যোগ দেন রিয়াজউদ্দিন। ১৯৬০ সালে ভাগ্নে মাইজুদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে চকবাজারে চালু করেন ‘রিয়াজ স্টোর’। তৎকালীন উর্দু রোডের ছোট কারখানায় মাত্র ৮টি সেলাই মেশিন নিয়ে পুরুষদের শার্ট ও নারীদের পোশাক তৈরি শুরু হয়। জাপানি কাপড়ে বানানো তাদের বিশেষ শার্ট দ্রুতই দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়। চাহিদা সামলাতে কারখানায় সেলাই মেশিনের সংখ্যা করা হয় ২০টি।
মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে নতুন শুরু
ষাটের দশকের শেষে রপ্তানির সুযোগ খুঁজতে রিয়াজউদ্দিন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে গেলেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সব থমকে দেয়। পাকিস্তানি বাহিনী চকবাজারের দোকান ও কারখানা পুড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে নতুন উদ্যোমে চালু করেন ‘রিয়াজ গার্মেন্টস লিমিটেড’, যা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম তৈরি পোশাক কারখানা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
প্রতিষ্ঠানের প্রসারে রিয়াজউদ্দিন গ্রহণ করেন অভিনব প্রচার কৌশল। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ থিম প্রচারে সাইকেল রেসে স্পন্সর করা, কলকাতার মোহনবাগান ক্লাবের ফুটবলারদের রিয়াজ শার্ট উপহার দেওয়া এবং চিত্রনায়ক রাজ্জাককে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে যুক্ত করার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ফ্রান্সে ঐতিহাসিক প্রথম রপ্তানি
১৯৭৮ সালের ২৮ জুলাই ঘটে সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। ফরাসি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘হল্যান্ডার ফ্রাঁস’-এর কাছে ১০ হাজার পিস রিয়াজ শার্ট রপ্তানি করা হয়। তৎকালীন ফরাসি মুদ্রায় যার মূল্য ছিল ১৩ মিলিয়ন ফ্রাঁ (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা)। এর মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
পোশাক শিল্পে নারী কর্মসংস্থানের সূচনা
১৯৭৭ সালে পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিক নিয়োগের প্রথা ভাঙেন রিয়াজউদ্দিন। সামাজিক বাধা দূর করতে তিনি প্রথমে নিজের এসএসসি পাস করা মেয়ে ফাতেমা বেগমকে ১০০ টাকা বেতনে কারখানায় কাজে নেন। তাকে দেখে স্থানীয় অন্য নারীরাও উৎসাহিত হন এবং প্রথম ধাপে ৫ জন নারী কর্মী রিয়াজ গার্মেন্টসে যোগ দেন।
ব্যবসার বিস্তার ও সমাপ্তি
১৯৯৮ সালে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে স্থাপিত হয় ‘রিয়াজ এক্সপোর্ট অ্যাপারেল’। জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ১০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হতো তাদের তৈরি পোশাক। বার্ষিক রপ্তানি আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩০ কোটি টাকায়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা ব্র্যান্ড জর্জের (যা পরবর্তীতে ওয়ালমার্ট অধিগ্রহণ করে) জন্য বিপুল পরিমাণ স্কুলের ইউনিফর্ম তৈরি করত প্রতিষ্ঠানটি।তবে আন্তর্জাতিক এক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এবং ব্যাংক ঋণের বোঝা এড়াতে ২০০৮ সালে কারখানাটি বন্ধ করে দেয় পরিবারটি।
১৯৩৪ সালের ৩ অক্টোবর জন্ম নেওয়া এই দূরদর্শী উদ্যোক্তা ২০০৫ সালের ৫ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন বিজিএমইএ-র প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি। বর্তমানে তার ছেলে সালাউদ্দিন অ্যাপারেল সোর্সিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ঐতিহ্যের ‘রিয়াজ শার্ট’ আবারও নতুন করে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন লালন করছেন।


