দেশে লবণের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ঘাটতিতে পড়ায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। এর সঙ্গে ভোজ্য ও শিল্প—দুই খাতেই চাহিদা বাড়ায় কমে আসছে মজুদ। এমন পরিস্থিতিতে গত এক বছরে পাইকারি বাজারে অপরিশোধিত লবণের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) লবণ সেলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি মণ (৪০ কেজি) অপরিশোধিত লবণের দাম ৩৮০ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ দাম ছিল ২৫৩ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রতি মণে দাম বেড়েছে ১২৭ টাকা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এরই মধ্যে দাম আরও বেড়ে প্রতি মণ লবণ প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কক্সবাজারের ইসলামপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম আজাদ বলেন, দেশের লবণের চাহিদা ও ঘাটতি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ফলে বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন মৌসুম শুরুর আগে আমদানির প্রক্রিয়া শেষ করা না গেলে সংকট আরও বাড়তে পারে।

বিসিকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে দেশে ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৬ টন। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ৭৪ টন।

শুধু লক্ষ্যমাত্রাই নয়, আগের মৌসুমের তুলনাতেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে দেশে রেকর্ড ২৪ লাখ ৩৮ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়েছিল। পরের মৌসুমে উৎপাদন কমে ২২ লাখ ৫৫ হাজার টনে নেমে আসে। সর্বশেষ মৌসুমে তা আরও কমে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার টনে ঠেকেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ ছিল প্রতিকূল আবহাওয়া। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ২৫ মে পর্যন্ত মোট ১৯৪ দিন লবণ উৎপাদনের মৌসুম চলেছে। এ সময়ে কুয়াশা, বৃষ্টি ও অন্যান্য বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ দিন চাষীরা মাঠে কাজ করতে পারেননি। ফলে সম্ভাব্য উৎপাদন সময়ের বড় একটি অংশ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

এর পাশাপাশি লবণ চাষের জমি সম্প্রসারণের গতিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে নতুন ও আগের মজুদ মিলিয়ে লবণ ছিল ৫ লাখ ৯৬ হাজার ১৮৪ টন। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ১৫০ টন ছিল পরিবহনাধীন। ফলে সরাসরি ব্যবহারের জন্য মজুদ রয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৬১ হাজার টন।

নতুন মৌসুমে উৎপাদন শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই মজুদ দিয়ে দেশের চাহিদা মেটানো কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মিল মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ অবস্থায় সম্ভাব্য সরবরাহ ঘাটতি মোকাবেলায় দেড় লাখ টন লবণ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বিসিকের লবণ সেল। এ জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে প্রস্তাবটি।

বিসিকের মহাব্যবস্থাপক ও লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার আলম বলেন, দেশের মোট চাহিদার বড় অংশই স্থানীয় উৎপাদন থেকে পূরণ করা হয়। এবার উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে দামও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তাই নতুন মৌসুম শুরুর আগ পর্যন্ত সরবরাহ ঠিক রাখতে সীমিত পরিমাণ লবণ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ২২ থেকে ২৫ লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়। অপরিশোধিত লবণ পরিশোধন ও আয়োডিনযুক্ত করার প্রক্রিয়ায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পরিমাণ কমে যায়। এর মধ্যে আয়োডিনযুক্ত ভোজ্য লবণের বার্ষিক চাহিদা ৮ লাখ টনের বেশি। শিল্প খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লবণ ব্যবহার হয়, যার মধ্যে টেক্সটাইল ও চামড়া শিল্প অন্যতম।

দেশের লবণ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল। সর্বশেষ মৌসুমে প্রায় ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে ৪০ হাজার ১৫০ জনের মতো চাষী লবণ উৎপাদনে যুক্ত ছিলেন।

ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের আশঙ্কা, নতুন মৌসুম শুরু হওয়ার আগে বর্তমান মজুদ আরও কমে গেলে বাজারে সরবরাহ সংকট তীব্র হতে পারে। এরই মধ্যে খোলা ও নন-ব্র্যান্ডেড লবণের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

তাদের মতে, দ্রুত নতুন মৌসুমের উৎপাদন শুরু এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি নিশ্চিত করা না গেলে লবণের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়তে পারে।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com