তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ফের অনিশ্চয়তার মুখে দেশের রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাত। গত দুই বছরে প্রায় ৪৩৬টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে অন্তত আড়াই লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। তবে একই সময়ে নতুন করে উৎপাদনে এসেছে ৩৩৬টি কারখানা, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় দুই লাখ মানুষের।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংকটের পর এবার জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা পোশাক শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন, বাড়ছে পরিচালন ব্যয় এবং কমছে কারখানার সক্ষমতার ব্যবহার।

বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সংগঠনটির সদস্যভুক্ত ২৬০টি ওভেন পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বিপরীতে, একই সময়ে নতুন করে ২৩৮টি কারখানা সদস্যপদ পেয়েছে, যেখানে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

তবে প্রকৃত কর্মহীন মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, সাবকন্ট্রাক্টে কাজ করা অনেক ছোট কারখানা বিজিএমইএর ডাটাবেজের বাইরে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং ও এলসি সুবিধা না থাকায় কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সঠিক তথ্যও অনেক সময় পাওয়া যায় না।

নিট পোশাক খাতেও রয়েছে একই ধরনের সংকট। বিকেএমইএর হিসাবে, গত দুই বছরে ১৭৬টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কর্মহীন হয়েছেন ৭৮ হাজার ৯৮৩ জন শ্রমিক। অন্যদিকে, নতুন করে ১৬০টি কারখানা সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যেখানে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে ১ লাখ ৮৯০ জনের।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, একটি কারখানা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় না। উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়। ফলে কারখানা বন্ধ হওয়ার সময় যে সংখ্যক শ্রমিক কর্মরত থাকেন, পরিসংখ্যানে মূলত সেই সংখ্যাই উঠে আসে। এতে প্রকৃত কর্মহীন মানুষের সংখ্যা নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়ে।

এদিকে পোশাক শ্রমিকদের সঠিক সংখ্যা ও কর্মসংস্থানের বর্তমান চিত্র জানতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, সংগঠনটির ডাটাবেজে প্রায় এক কোটি শ্রমিকের বায়োমেট্রিক তথ্য রয়েছে। বর্তমানে সক্রিয় শ্রমিক হিসেবে প্রায় ৩৭ লাখের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এসব তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে ভেরিফিকেশন চলছে।

পোশাক খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। সিআইডিডির গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির বলেন, বর্তমানে অনেক কারখানা তাদের সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করে উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার ৮০ শতাংশে নেওয়া গেলে শিল্পে গতি ফিরবে, বাড়বে উৎপাদন এবং ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও তৈরি হবে।

কারখানা মালিকদের দাবি, গ্যাস সংকটের কারণে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের পাশাপাশি নানা অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে। এতে পোশাক উৎপাদনের সামগ্রিক খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের রফতানি আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক খাত। তাই সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু পোশাক শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, পুরো অর্থনীতিতেই পড়তে পারে। এ অবস্থায় কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com