ঈদুল আজহা বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) ক্যাম্পাসে এক ভিন্ন আবহ নিয়ে আসে। বছরের ব্যস্ত ক্লাস, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট আর প্রেজেন্টেশনের চাপ কাটিয়ে ঈদের আগে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে নিজ নিজ পরিবারের দিকে ফিরে যেতে শুরু করে। ব্যাগ গোছানো, শেষ মুহূর্তের যাত্রার প্রস্তুতি আর ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার সেই পরিচিত ব্যস্ততা মিলিয়ে পুরো পরিবেশে এক ধরনের আবেগময় নীরবতা নেমে আসে।
যে হলগুলো সারা বছর প্রাণচঞ্চল থাকে, সেগুলো ঈদের সময় হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে যায়। কোরবানির ঈদ এখানে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয় বরং ত্যাগ, সহমর্মিতা, আত্মশুদ্ধি এবং মানুষের প্রতি মানুষের সম্পর্ককে নতুনভাবে অনুভব করার এক বিশেষ উপলক্ষ। আর তাই ঈদুল আজহাকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝেও দেখা যায় ভিন্ন এক আবেগ ও উপলব্ধি।
ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন বিভাগ ও ভিন্ন অভিজ্ঞতার শিক্ষার্থীরা ঈদকে দেখেন ভিন্ন চোখে, তবে অনুভূতির কেন্দ্রে থাকে একই জায়গা – মানবতা, সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা।বুটেক্সের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ঈদ উপলক্ষে তাঁদের অনুভূতি তুলে ধরেছে, ভিন্ন বাক্য তবুও একই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে সবার মধ্যে।
অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সুমাইয়া ইসলাম বৃষ্টি বলেন, “ঈদুল আজহা শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও মানবিকতার এক গভীর শিক্ষা। কোরবানির মূল চেতনা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার মানসিকতা গড়ে তোলা। ছোটবেলা থেকেই আমাদের পরিবারে কোরবানির মাংস গরিব মানুষের মাঝে নিজের হাতে পৌঁছে দেওয়ার শিক্ষা পেয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে মানুষের কষ্ট ও অনুভূতি বুঝতে শিখিয়েছে। সময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করেছি, ঈদের প্রকৃত আনন্দ নতুন পোশাক বা আয়োজনের মধ্যে নয়; বরং অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই এর সৌন্দর্য নিহিত। কোরবানির এই শিক্ষা মানুষকে আরও বিনয়ী, দায়িত্বশীল ও মানবিক হতে শেখায়।”
ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. তাহফিমুল ইসলাম মিতুল বলেন, “কোরবানির ঈদ আমার কাছে আনন্দ, ত্যাগ ও মানবিক উপলব্ধির এক বিশেষ সময়। শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে পরিবারের কাছে ফেরা, সবার সঙ্গে সময় কাটানো এবং ঈদের নামাজ ও কোরবানির আয়োজন পুরো পরিবারকে একত্র করে। ঈদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাকে ত্যাগ করা। কোরবানির মাংস সবার মাঝে ভাগ করে দেওয়ার মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা ও সমতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। ছোটবেলার ঈদের অনেক কিছু বদলে গেলেও ঈদের মূল অনুভূতি এখনো একই—ত্যাগ, ভালোবাসা আর সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করা।”
ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রামিসা হক চৌধুরীর মতে, “কোরবানির ঈদ আমার কাছে ত্যাগ, ভালোবাসা ও মানবতার শিক্ষা। ঈদের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো সবাইকে নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করা। ইসলাম ধর্মের উৎসব হলেও এই ঈদ আমাদের শেখায় মানুষে মানুষে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে। কোরবানির মূল শিক্ষা আমি দেখি নিজের ইচ্ছার চেয়ে আল্লাহর নির্দেশকে প্রাধান্য দেওয়ার মধ্যে। ছোটবেলায় ঈদ মানে শুধু আনন্দ ছিল, কিন্তু এখন এর সঙ্গে দায়িত্ববোধ ও অংশগ্রহণও যুক্ত হয়েছে। আমার কাছে কোরবানি মানে নিজের ভেতরের অহংকার ও নেতিবাচক প্রবৃত্তিকে ত্যাগ করে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করা।”
টেক্সটাইল মেশিনারি ডিজাইন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ম্যানুয়েল অধিকারী স্পন্দন মনে করেন, “কোরবানির ঈদ শুধু মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানুষে মানুষে সম্পর্ক, সহমর্মিতা ও ভাগাভাগিরও উৎসব। মুসলিম বন্ধুদের ঈদ উদযাপন সবসময়ই আমার ভালো লাগে। কয়েকবার বন্ধুদের বাসায় ঈদের দাওয়াতে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। তাদের পরিবারের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা আমাকে খুব আপন অনুভব করিয়েছে। ছোটবেলায় ঈদকে শুধু ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখলেও এখন বুঝি, এর ভেতরে ত্যাগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার গভীর শিক্ষা রয়েছে। কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন ও অসচ্ছল মানুষের মাঝে বিতরণের বিষয়টি সমাজে সমতা ও সম্প্রীতির সুন্দর উদাহরণ তৈরি করে।”
ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আনজুম আবদুল্লাহ ত্বাহা সবাইকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “মুসলমানদের জীবনে প্রতি বছর সবচেয়ে বড় দুটি আনন্দের উপলক্ষ্য হলো দুই ঈদ। এর মধ্যে ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই ঈদ শুধু আনন্দের নয়, বরং ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার এক অনন্য শিক্ষা দেয়।বুটেক্সে পড়াশোনার জীবনের ব্যস্ততা তুলে ধরে তিনি বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ক্লাস, শেষ দুই সপ্তাহের ক্লাস টেস্ট, ভাইভা, অ্যাসাইনমেন্ট আর নানা ব্যস্ততার মাঝেও ঈদের কথা মনে হলে মন এক ভিন্ন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। ঈদুল আযহা আমাদের শেখায় কোরবানি কেবল পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের অহংকার, স্বার্থপরতা ও খারাপ প্রবৃত্তিকে ত্যাগ করাও এর বড় শিক্ষা।”
ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. সাকিব পারভেজ শীতল কোরবানির ঈদকে দেখেন মানবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা হিসেবে। তার মতে, “ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়া হয়। কোরবানি শুধু পশু উৎসর্গ নয়, বরং নিজের ভেতরের অহংকার ও স্বার্থপরতা ত্যাগের শিক্ষা। ছোটবেলার ঈদ এবং বর্তমান ঈদের পার্থক্য রয়েছে। এখন ঈদে দায়িত্ববোধ ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর গুরুত্ব বেড়েছে। কোরবানির ঈদ হলো ত্যাগ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক পবিত্র উৎসব।”
শিক্ষার্থীদের অনুভূতিতে বারবার উঠে এসেছে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা—নিজের অহংকার, স্বার্থপরতা ও লোভকে ত্যাগ করে মানবিকতা ও সহমর্মিতার পথে এগিয়ে যাওয়া। ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ভিন্ন উপলব্ধির মাঝেও সবাই যেন এক জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে — মানবতা ও সম্প্রীতির বন্ধনে। কোরবানির ঈদ তাই শুধু আনন্দের উৎসব নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, দায়িত


