EMMTEX SLN Textile Industry Advertisement Banner

বিশ্বের তৈরি পোশাক খাতে স্বল্পমূল্যের কটন টি-শার্ট উৎপাদন ও রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে বাংলাদেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে ২০২৫ সালে আমদানি হওয়া কটন টি-শার্টের ৬১ শতাংশই এসেছে বাংলাদেশ থেকে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া প্রতি পিস টি-শার্টের গড় মূল্য ছিল ২ দশমিক ৬ মার্কিন ডলার, যা বৈশ্বিক গড় দামের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাবলিক আই এবং ক্লিন ক্লথস ক্যাম্পেইনের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন ‘Squeezed Dry: Pricing Pressure in the Global Fashion Industry’-এ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালে কটন টি-শার্ট রপ্তানিতে চীনকে ছাড়িয়ে যায় বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী কটন টি-শার্ট রপ্তানির ২০ শতাংশই ছিল বাংলাদেশের দখলে। গবেষণায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার বদলে কম ব্যয়ের উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাংলাদেশ এখনো বেসিক পোশাক উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হলেও ধীরে ধীরে ভ্যালু অ্যাডেড পণ্যের দিকে এগোচ্ছে। তার ভাষ্য, টি-শার্টের মতো বেসিক পণ্যের চাহিদা বিশ্ববাজারে সবসময় থাকবে, তবে ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় বর্তমান মূল্য কাঠামো ধরে রাখা কঠিন হবে।

তিনি আরও বলেন, একসময় ইউরোপ ও চীনে কেন্দ্রীভূত থাকা টেক্সটাইল শিল্প ধীরে ধীরে বাংলাদেশে এসেছে। ভবিষ্যতে নতুন উৎপাদন হাব তৈরির চেষ্টা চলছে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও। তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে সে প্রচেষ্টা টেকসই হয় না।

গবেষণায় বলা হয়েছে, গত দুই দশকে ইইউ বাজারে যেসব দেশ কম দামে টি-শার্ট সরবরাহ করেছে, তাদের বাজার অংশীদারত্ব বেড়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে গড়ের নিচে মূল্য বজায় রাখায় দ্রুত বাজার সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে চীনে উৎপাদন খরচ বাড়ার পর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সেখান থেকে অর্ডার কমিয়ে বাংলাদেশমুখী হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে শেইন, টেমু ও অন্যান্য ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম আরও কম দামের প্রতিযোগিতা তৈরি করায় বৈশ্বিক বাজারে মূল্যচাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে ইইউতে বাংলাদেশি কটন টি-শার্টের গড় আমদানি মূল্য ছিল প্রতি কেজিতে ১৩ ডলার, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১৬ ডলার। গবেষকদের মতে, পোশাকের এই কম মূল্য কোনো সাময়িক বিষয় নয়; বরং ফাস্ট ফ্যাশন শিল্পের ব্যবসায়িক কাঠামোরই অংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৫ বছরে বিশ্বজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে, কিন্তু পোশাকের সোর্সিং মূল্য প্রায় স্থির রয়েছে। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উৎপাদন দেশ থেকে টি-শার্টের প্রকৃত সোর্সিং মূল্য প্রতি বছর গড়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করে কমেছে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে দরকষাকষিতে বাংলাদেশের কারখানা মালিকরা অসম ক্ষমতার মুখোমুখি হন। ক্রেতারা নির্দিষ্ট টার্গেট মূল্য নির্ধারণ করে দেয় এবং একটি কারখানা রাজি না হলে অন্য কারখানায় অর্ডার সরিয়ে নেয়। ফলে সীমিত মুনাফায়ও কারখানাগুলোকে অর্ডার নিতে বাধ্য হতে হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে যেখানে প্রতি পিস পোশাকে ১০ টাকা পর্যন্ত মুনাফা থাকত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৩ টাকায়। গত ছয় মাসে দেশে অন্তত ১৮২টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় শ্রমিকদের মজুরি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা হলেও একটি পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় প্রায় ৪৮ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বর্তমান মজুরি কাঠামোকে ‘দারিদ্র্য মজুরি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

গবেষকদের দাবি, বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো টেকসই উন্নয়ন, ন্যায্য মজুরি ও দায়িত্বশীল ক্রয় ব্যবস্থার কথা বললেও বাস্তবে তারা এমন দামে অর্ডার দিচ্ছে, যা নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়।

About The Author

সম্পাদক
ইঞ্জি: আতিকুর রহমান আতিক
Email: Contact@textilemirrorbd.com