ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব বোনাস পরিশোধের পরিস্থিতি বেশ ইতিবাচক। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকরা তাঁদের ঈদ বোনাস হাতে পেয়েছেন।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য বলছে, এই দুই অঞ্চলের মোট ২ হাজার ১২৭টি সচল কারখানার মধ্যে ২ হাজার ৫১টি কারখানায় ইতিমধ্যে ঈদ বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯৬.৪৩ শতাংশ কারখানার শ্রমিকরা উৎসবের আগে বোনাস পেয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসের বেতন প্রায় সব কারখানায়ই পরিশোধ করা হয়েছে, যার হার ৯৯.৯৫ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনও ৯৮.২৬ শতাংশ বা ২ হাজার ৯০টি কারখানায় দেওয়া হয়েছে। ফলে বেতন-বোনাস নিয়ে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা আপাতত নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ঈদ সামনে রেখে অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের কাজ প্রায় শেষ। শ্রমিকরা যেন নির্বিঘ্নে বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারেন—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।
তবে তিনি জানান, কিছু সাব-কন্ট্রাক্ট বা ঠিকা কারখানা রয়েছে যেগুলো বিজিএমইএর সদস্য নয়। এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা অঞ্চলে মোট ১ হাজার ৭৮৫টি সচল কারখানার মধ্যে প্রায় সব কারখানায় জানুয়ারি মাসের বেতন দেওয়া হয়েছে। ফেব্রুয়ারির বেতন পরিশোধ হয়েছে ১ হাজার ৭৫৬টি কারখানায়। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে ১ হাজার ৭২৪টি কারখানা বা ৯৬.৫৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বোনাস দিয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৩৪২টি সচল কারখানার সবকটিতেই জানুয়ারির বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির বেতন দেওয়া হয়েছে ৩৩৪টি কারখানায় এবং ৩২৭টি কারখানায় বা ৯৫.৬১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে ঈদ বোনাস দেওয়া হয়েছে।কয়েকটি কারখানায় বোনাস পরিশোধ এখনো বাকি থাকলেও দ্রুত তা সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঈদের আনন্দ বাড়াতে অনেক কারখানা শ্রমিকদের মার্চ মাসের অগ্রিম বেতন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। মোট ৪৭৮টি কারখানা বা প্রায় ২২.৪৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা অঞ্চলে প্রায় ২৫.৬৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫.৮৫ শতাংশ কারখানা শ্রমিকদের অগ্রিম বেতন দেবে।
প্রতিবেদনে শ্রমিকদের ঈদযাত্রার সম্ভাব্য সময়সূচিও তুলে ধরা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ১৬ মার্চ প্রায় ১৫ শতাংশ কারখানার শ্রমিক ঢাকা ছাড়বেন। ১৭ মার্চ প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং ১৮ মার্চ সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমিক নিজ নিজ এলাকায় রওনা হবেন। অবশিষ্ট ৫ শতাংশ শ্রমিক ১৯ মার্চের মধ্যে ঢাকা ছাড়বেন। শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলে প্রশাসনের তদারকি জোরদার করা হয়েছে। শিল্প পুলিশ, শ্রম প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, শেষ কর্মদিবসে বোনাস দেওয়া হলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে এবং সড়ক অবরোধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই আগেই বোনাস পরিশোধ করা প্রয়োজন।
শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিন জানান, বেশির ভাগ কারখানায় ফেব্রুয়ারির বেতন ও ঈদ বোনাস ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। তবে কিছু কারখানায় এখনো বকেয়া রয়েছে, বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের মালিক বিদেশে অবস্থান করছেন বা পলাতক।
তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে পাঁচ থেকে ১০টি কারখানায় মজুরি পরিশোধ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এসব কারখানার শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, এখনো কিছু কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস বাকি রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও মালিকপক্ষ সময়মতো অর্থ না দিয়ে শ্রমিকদের ভোগান্তিতে ফেলছে। তবে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে ঈদুল ফিতর সামনে রেখে দেশের পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের অগ্রগতি সন্তোষজনক। এতে শিল্পাঞ্চলে স্বস্তির পরিবেশ বজায় থাকছে এবং শ্রমিকরাও উৎসবের প্রস্তুতি নিতে পারছেন।

