দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও ব্যয়চাপের পর অবশেষে কিছুটা স্বস্তির আলো দেখতে শুরু করেছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে—যার ইতিবাচক প্রভাব ধীরে ধীরে এসে পৌঁছাচ্ছে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতেও।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একদিনেই প্রায় ১০.৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৮.৮০ ডলারে নেমেছে, আর ডব্লিউটিআই কমেছে ১১.৪ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ৮৩ ডলারে। জ্বালানি বাজারের এই পতনকে বিশ্লেষকরা দেখছেন সরবরাহ ব্যবস্থায় আস্থার ফিরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে।
গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গত কয়েক মাসে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন উদ্যোক্তারা। এখন তেলের দাম কমায় ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচে স্বস্তি আসবে—এমন প্রত্যাশা করছেন তারা। খাত সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, জ্বালানি ব্যয় কমার প্রভাবে মোট উৎপাদন খরচ ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বড় একটি সুবিধা এনে দিতে পারে।
শুধু জ্বালানি নয়, শিপিং খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলছে। সংঘাতের সময় বিকল্প রুট ব্যবহারের কারণে ইউরোপ ও আমেরিকাগামী পণ্যের পরিবহন ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল, আর ডেলিভারি সময় দীর্ঘ হয়েছিল প্রায় এক থেকে দেড় সপ্তাহ। এখন প্রণালীটি খুলে দেওয়ায় সেই চাপ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, শিপিং খরচ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে এবং লিড টাইম ৫–৭ দিন কমে আসবে—যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কাঁচামাল সরবরাহেও স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। সংঘাতের সময় সুতা ও কাপড়ের দাম ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। সরবরাহ পথ স্বাভাবিক হলে এই দাম ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন আমদানিকারকরা। এতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পেও উৎপাদন স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
বৈশ্বিক বাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সূচক সাম্প্রতিক সময়ে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে রয়েছে, যা ভোক্তা আস্থা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় হতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন রপ্তানিকারকরা।
তবে এই স্বস্তি যে পুরোপুরি নির্ভার হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, তা বলছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এখনও নাজুক। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আবার বাড়লে সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে বিঘ্ন ঘটতে পারে। সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকিও পুরোপুরি কাটেনি।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হওয়া বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচক মোড় তৈরি করেছে। জ্বালানি ব্যয় হ্রাস, শিপিং সহজীকরণ এবং কাঁচামালের দাম কমার সম্মিলিত প্রভাবে খাতটি আবার গতি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়—এই স্বস্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, আর সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতটি।

