রাশিয়ার এক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার (চার কোটি ডলার) বকেয়া বিল পরিশোধ না করে বাংলাদেশে নতুন সব ধরনের পোশাকের ক্রয়াদেশ (অর্ডার) স্থগিত করেছে পোল্যান্ডের জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘এলপিপি’। একই সঙ্গে স্থানীয় সরবরাহকারীদের নতুন কোনো পণ্য তৈরির নকশা পাঠানোও বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।রপ্তানিকারকদের দায়ের করা আইনি প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বাঁচাতে এবং ব্যবসায়িক চাপ তৈরি করতে পোলিশ এই পোশাক জায়ান্ট এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিবাদের নেপথ্যে ১৮ মাসের বকেয়া ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
তৈরি পোশাক খাত সূত্রে জানা যায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় সরাসরি ব্যবসা পরিচালনায় আইনি জটিলতা তৈরি হলে এলপিপি ‘এফইএস রিটেইল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে পোশাকের অর্ডার দেওয়া ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করে। এলপিপির দেওয়া নিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি তৈরি পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউস পণ্য তৈরি করে পাঠায়।শুরুর দিকে নিয়মিত বিল মেটানো হলেও গত ১৮ মাস ধরে অর্থ পরিশোধ সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। পরে এলপিপি দাবি করে, এফইএস রিটেইলের সঙ্গে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। পাওনা আদায়ে কোনো গতি না দেখে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা আইনি ব্যবস্থা নিলে, মামলা প্রত্যাহারের শর্তে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেয় এলপিপি। এমনকি বকেয়া অর্থের ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়, যা মেনে নেওয়া স্থানীয় কারখানাগুলোর পক্ষে অসম্ভব।
কালো তালিকার হুঁশিয়ারি ও পোশাক খাতের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৭০ কোটি (৭০০ মিলিয়ন) ডলার সমমূল্যের পোশাক সংগ্রহ করে এলপিপি। ফলে হঠাৎ করে এই ব্র্যান্ডের অর্ডার স্থগিত করার সিদ্ধান্ত দেশের পোশাক খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।তবে বকেয়া পরিশোধ না করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)।
সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন: “বাংলাদেশ থেকে তারা পণ্য কিনবে কি না, তা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে আমাদের পাওনা পরিশোধ না করলে বাংলাদেশে এলপিপিকে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ফোরামেও তুলে ধরা হবে।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) সভাপতি আবদুল হামিদ ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর ক্ষতিপূরণ আদায়ের পাশাপাশি ৭০ কোটি ডলারের এই বাণিজ্য যেন হাতছাড়া না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
লোকসানের মুখে স্থানীয় সরবরাহকারীরা
পাওনা টাকা আটকে থাকায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট কারখানা মালিকেরা।
হেজাজ সোয়েটার্স লিমিটেড:
প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪৯ হাজার ডলার মূল্যের পণ্য গত এক বছর ধরে গুদামে পড়ে রয়েছে। কাঁচামাল ও শ্রমিকদের মজুরি ইতোমধ্যে পরিশোধ করায় তারা এখন বড় ধরনের আর্থিক লোকসানে।
শ্রাবণী নিটওয়্যার:
তারা প্রায় ৭০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেও কোনো টাকা পায়নি। পাশাপাশি আরও ৩০ হাজার ডলারের তৈরি পণ্য তাদের গুদামে জমে আছে।রপ্তানিকারকদের মতে, প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও পোশাক সংগ্রহের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল জায়গা। নিজেদের দায় এড়াতে ও বাংলাদেশি কারখানাগুলোকে ভয় দেখাতে এলপিপি ক্রয়াদেশ স্থগিতের এই ঘোষণা দিয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

