বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাকের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) সামগ্রিক আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। উচ্চ সুদের হার, ভোক্তা ব্যয় হ্রাস ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে মার্কিন ক্রেতারা তৈরি পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে দেশটির মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ২৮ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।যুক্তরাষ্ট্রের এই সংকুচিত বাজারে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি কমলেও, মে মাসের একক পরিসংখ্যানে তৈরি পোশাক খাতে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিবাচক আভাস মিলেছে।

৫ মাসের সামগ্রিক চিত্র:

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটিইএক্সএ) তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৫ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।

মূল্যের পাশাপাশি রপ্তানির পরিমাণও (ভলিউম) কমেছে ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। এই ৫ মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৮৫ মিলিয়ন বর্গমিটার সমমানের (এসএমই) পোশাক পাঠানো হয়েছে। একই সাথে পোশাকের গড় ইউনিট মূল্যও ২ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৯৯ ডলারে নেমে এসেছে।

মে মাসে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন ইঙ্গিত

পাঁচ মাসের সামগ্রিক চিত্র নেতিবাচক হলেও মে মাসের একক তথ্য বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য স্বস্তি নিয়ে এসেছে। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ বেড়ে ৫৮২ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।এ মাসে পোশাক রপ্তানির পরিমাণও বেড়েছে ৭ শতাংশ। পোশাক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শুরুর দিকের দুর্বল অর্ডার পরিস্থিতি কেটে গিয়ে বছরের দ্বিতীয় ভাগে ক্রয়াদেশ আরও বাড়ার পথ তৈরি করছে এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি।

চীনের বড় পতন, সুবিধাজনক অবস্থানে প্রতিদ্বন্দীরা

চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে চীন। দেশটির পোশাক রপ্তানি নাটকীয়ভাবে ৪২ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং মার্কিন ক্রেতাদের বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রের খোঁজের কারণে চীনের এই পতন হয়েছে। এছাড়া ভারতের রপ্তানি ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের রপ্তানি ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমেছে।তবে বৈশ্বিক এই মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ৫ মাসে কম্বোডিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ, চীনের হারানো বাজারের সুবিধা অন্য প্রতিযোগী দেশগুলো বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগাতে পেরেছে।

বাজার ধরতে বাংলাদেশের করণীয় কী?

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, মে মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বছরের শুরুর মন্দা ভাব কাটাতে শুরু করেছে। তবে এটিকে স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যাবে না, আগামী কয়েক মাস বাজার পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহের উৎস বহুমুখী করছেন। এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে কিছু জায়গায় দ্রুত উন্নতি করতে হবে। বাংলাদেশের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা ও পরিবেশবান্ধব কারখানার সুবিধা রয়েছে। এখন প্রয়োজন দ্রুত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেড ফাইবারের পোশাক তৈরিতে জোর দেওয়া এবং ব্যবসার খরচ কমানো। সরকার ও শিল্প মালিকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল চীনের ছেড়ে দেওয়া বাজারের বড় অংশ দখল করা সম্ভব।

About The Author


স্বত্ব © ২০২৬ টেক্সটাইল মিরর
Email: contact@textilemirrorbd.com