বিশ্ববাজারের মন্দাভাব আর ভূরাজনৈতিক নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত তার চাকা সচল রেখেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট রপ্তানি সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কঠিন সময়েও দেশের শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বিশ্ববাজারে তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছে।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের চ্যালেঞ্জ সামলে এই ১০টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান একাই বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এনেছে, পাশাপাশি নিশ্চিত করেছে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান।
২০২৬ সালের বর্তমান রপ্তানি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি পোশাক তৈরি কারখানার (গার্মেন্টস) তালিকা তুলে ধরা হলো-
১. ওভেন ও সামগ্রিক রপ্তানিতে আধিপত্য হা-মীম এবং স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের
তৈরি পোশাক খাতের ‘ওভেন’ ক্যাটাগরি এবং সামগ্রিক রপ্তানি ভলিউমে এককভাবে দেশের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে হা-মীম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। ওভেন প্যান্ট, শার্ট, ডেনিম এবং জ্যাকেট রপ্তানি করে তারা বার্ষিক সর্বোচ্চ ৮৫০+ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে এবং প্রায় ৫০,০০০+ কর্মীর কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। ওভেন পোশাকের এই বিশাল বাজারে তাদের পরেই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ লিমিটেড। প্রায় ৪০,০০০+ কর্মী নিয়ে তারা ওভেন শার্ট, ট্রাউজার এবং সোয়েটার রপ্তানির মাধ্যমে বছরে ৩৫০+ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে এই খাতে নিজেদের অন্যতম শীর্ষ প্রতিযোগী হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।
২. প্রিমিয়াম ডেনিম ও হাই-এন্ড পোশাকে সেরা প্যাসিফিক জিন্স এবং এনভয়
বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের ‘প্রিমিয়াম ডেনিম’ এবং ক্যাজুয়াল ওয়্যার সরবরাহে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে চট্টগ্রাম ইপিজেড ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড। প্রায় ৩৫,০০০+ কর্মী এবং বার্ষিক ৫০০+ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল রপ্তানি আয় নিয়ে তারা এই বিশেষায়িত খাতে দেশের এক নম্বর ডেনিম রপ্তানিকারক। ডেনিমের এই প্রিমিয়াম বাজারে তাদের পরেই শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে এনভয় টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস গ্রুপ। ডেনিম ফেব্রিক্স এবং হাই-এন্ড ওভেন পোশাক উৎপাদনে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে প্রায় ২০,০০০+ কর্মীর এই গ্রুপটি বছরে ৪০০+ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করছে।
৩. নিটওয়্যার ও ডাইংয়ের বৃহৎ শক্তিতে ডিবিএল এবং পলমল গ্রুপ
আরামদায়ক ও ক্যাজুয়াল পোশাকের ‘নিটওয়্যার’ ও ডাইং-স্পিনিং খাতে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে বাজারে বড় প্রভাব ধরে রেখেছে দুলাল ব্রাদার্স লিমিটেড (ডিবিএল) গ্রুপ। নিট পোশাকের বিশাল চাহিদা পূরণ করে তারা বছরে প্রায় ৪৫০+ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য বিদেশে পাঠাচ্ছে এবং প্রায় ৪৫,০০০+ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। নিটওয়্যার খাতের এই ধারাবাহিকতায় তালিকায় পরের অবস্থানে থেকে বড় অবদান রাখছে পলমল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রায় ২৫,০০০+ কর্মী নিয়ে তারা নিট ও ওভেন আইটেম, বিশেষ করে বিশ্বমানের টি-শার্ট ও পোলো শার্ট রপ্তানি করে বার্ষিক ২৮০+ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে।
৪. উচ্চ উৎপাদনশীলতা ও বিশ্বমানের ব্রান্ডিংয়ে স্কয়ার ও বেক্সিমকো
কম কর্মী নিয়েও আধুনিক প্রযুক্তি ও উচ্চ গুণগত মান নিশ্চিত করে ‘উচ্চ উৎপাদনশীলতা ও বিশ্বমানের ব্র্যান্ডিং’ এর ক্ষেত্রে অনন্য নজির গড়েছে স্কয়ার ফ্যাশনস লিমিটেড। স্কয়ার গ্রুপের এই অঙ্গপ্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১৩,০০০+ কর্মী নিয়ে উচ্চমানের নিট পোশাক ও আন্ডারগার্মেন্টস রপ্তানির মাধ্যমে বার্ষিক ৩০০+ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। ঠিক একইভাবে, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ার শীর্ষ সারির ব্র্যান্ডগুলোর প্রধান সরবরাহকারী বা ‘গ্লোবাল চেইন পার্টনার’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো) টেক্সটাইল ডিভিশন। প্রায় ৩০,০০০+ কর্মী নিয়ে ওভেন, নিটওয়্যার এবং ডেনিম খাতে তারা বছরে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করছে।
৫. জ্যাকেট, বাচ্চাদের পোশাক ও ফেব্রিক্স বৈচিত্র্যে এশিয়ান এবং এপিলিয়ন
পোশাকের বৈচিত্র্যকরণ, বিশেষ করে ‘জ্যাকেট ও বাচ্চাদের পোশাক’ তৈরির বিশেষায়িত কারিগরি দক্ষতায় বাজারে এগিয়ে রয়েছে এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেড (এশিয়ান গ্রুপ)। ওভেন প্যান্ট ও জ্যাকেটের পাশাপাশি শিশুদের পোশাক রপ্তানি করে প্রায় ২০,০০০+ কর্মীর এই প্রতিষ্ঠানটি বছরে ২৫০+ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। এই বৈচিত্র্যকরণের ধারায় নিজস্ব ‘টেক্সটাইল ফেব্রিক্স ও উন্নত নিটওয়্যার’ উৎপাদনে সেরা দক্ষতা দেখিয়ে তালিকার শীর্ষ দশে অবস্থান করছে এপিলিয়ন গ্রুপ। প্রায় ২০,০০০+ কর্মী এবং বার্ষিক ২৪০+ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় নিয়ে তারা দেশের নিট ও ফেব্রিক্স খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী দিনে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও প্রযুক্তির সংযোগ ঘটিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী অবস্থানে যাবে। টেকসই উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখন কেবল এগিয়ে চলার অপেক্ষায়।
লেখকঃ মো. তারেক রহমান


