বিশ্বের টেক্সটাইল শিল্প এখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রচলিত পোশাকের বাইরে প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষ ধরনের কাপড়ের চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত পরিচর্যা, শিল্পকারখানা কিংবা গৃহস্থালি ব্যবহার সবখানেই বাড়ছে ননওভেন কাপড়ের ব্যবহার। এই পরিবর্তনের ধারায় এক দশকের কম সময়েই উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে ভারতের প্রতিষ্ঠান ওয়েলস্পান অ্যাডভান্সড টেক্সটাইলস।
শুরুতে এটি ছিল ব্যবসা সম্প্রসারণের একটি উদ্যোগ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ননওভেন কাপড় উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি শক্তিশালী শিল্প। বর্তমানে স্পানলেস, নিডলপাঞ্চ এবং উন্নত রূপান্তর প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ কাপড় উৎপাদন করছে তারা। ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
টেকনিক্যাল টেক্সটাইল খাতের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী টেকটেক্সটাইল ইন্ডিয়ায় অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ও নতুন উদ্ভাবন তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানের গ্লোবাল ক্যাটাগরি প্রধান কিরণ ওয়ারিয়ার জানান, এই ব্যবসাটি এখনও তুলনামূলক নতুন হলেও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তার মতে, বর্তমান বাজারে গ্রাহকেরা এমন পণ্য চান যা মানসম্মত, নির্ভরযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব।
প্রযুক্তিনির্ভর কাপড়ে বাড়ছে চাহিদা
ননওভেন কাপড়ের চাহিদা বাড়ার পেছনে রয়েছে এর বহুমুখী ব্যবহার। শিশুদের ওয়াইপস, প্রসাধনী শিট মাস্ক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, গাড়ির অভ্যন্তরীণ অংশ, ফিল্টার কিংবা শিল্পকারখানার নানা কাজে এই কাপড় ব্যবহৃত হয়। এসব প্রয়োজনকে সামনে রেখে ওয়েলস্পান তাদের উৎপাদন কাঠামো গড়ে তুলেছে স্পানলেস, নিডলপাঞ্চ এবং তাপীয় বন্ধন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির স্পানলেস উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ২৭ হাজার মেট্রিক টনের বেশি, যা ভারতের মধ্যে অন্যতম বড়। উন্নত ইউরোপীয় উৎপাদন লাইনে বিভিন্ন ঘনত্বের কাপড় তৈরি করা সম্ভব। অন্যদিকে নিডলপাঞ্চ ইউনিটে ৬০ থেকে ৮০০ জিএসএম পর্যন্ত কাপড় তৈরি হয়, যার মধ্যে আগুন প্রতিরোধী বিশেষ ফাইবারও রয়েছে। এগুলো মূলত সুরক্ষা পোশাক এবং শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
এছাড়া শিশুদের ওয়াইপস, প্রসাধনী শিট মাস্ক এবং স্বাস্থ্যসেবাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্য তৈরির জন্য বড় পরিসরে রূপান্তর সুবিধাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এর ফলে দেশি ও আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের কাছে ধারাবাহিক মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তিই প্রধান শক্তি
উৎপাদনের মান ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যে অবস্থিত তাদের কারখানায় রয়েছে উচ্চগতির ইউরোপীয় স্পানলেস উৎপাদন লাইন এবং আধুনিক রূপান্তর সুবিধা।
এছাড়া শুকনা ওয়াইপস, খাদ্য পরিবেশন খাতে ব্যবহৃত পরিষ্কার কাপড়, প্রসাধনী শিট মাস্কসহ বিভিন্ন বিশেষ ধরনের কাপড় তৈরির জন্য মুদ্রণ, রং করা এবং আবরণ দেওয়ার প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির ফলে স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য ও শিল্পখাতের জন্য ভিন্নধর্মী পণ্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
কম দামের বাজার নয়, লক্ষ্য উচ্চমানের পণ্য
বিশ্ববাজারে অনেক প্রতিষ্ঠান কম দামের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লেও ওয়েলস্পান ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। তারা মূলত এমন খাতে কাজ করছে যেখানে মান, কর্মক্ষমতা এবং নির্ভরযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই কৌশলের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ভারতসহ আন্তর্জাতিক বাজারের বড় বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। ইতোমধ্যে হিমালয়া, ইউনিলিভার এবং ইউনিচার্মের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যবসার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে ভারতের বাজার থেকে, আর বাকি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়। এই ভারসাম্যপূর্ণ বাজার কাঠামো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়েও ব্যবসাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
টেকসই উৎপাদনে অগ্রাধিকার
শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিষয়টি মাথায় রেখে ওয়েলস্পান তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় টেকসই নীতি অনুসরণ করছে। জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক ব্যবহার, পুনর্ব্যবহার এবং পানি সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গুজরাটের আঞ্জার এলাকায় অবস্থিত তাদের কারখানায় টেক্সটাইল শিল্পের অন্যতম বড় পানি পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ব্যবহৃত পানি পরিশোধন করে আবার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়।
পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি ভিসকোজ, তুলা এবং বাঁশের মতো পরিবেশবান্ধব ফাইবার ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করেছে। ফলে গ্রাহকেরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মক্ষমতা এবং পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রেখে পণ্য নির্বাচন করতে পারেন।
প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং টেকসই উৎপাদনের সমন্বয়ের মাধ্যমে ওয়েলস্পান শুধু ভারতের ননওভেন কাপড় শিল্পেই নয়, বরং বৈশ্বিক উন্নত টেক্সটাইল খাতেও নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে কাজ করছে।

