Advertisement

বিশ্বের টেক্সটাইল শিল্প দ্রুত পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পানি, জ্বালানি ও পরিবেশগত চাপ—এই তিনটি চ্যালেঞ্জ এখন শিল্পটির সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। বিশেষ করে ডাইং ও ফিনিশিং প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ তাপ ও শক্তি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় এবং কার্বন নিঃসরণ দুটোই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে গবেষকরা নতুন একটি সম্ভাবনার দিকে নজর দিচ্ছেন—লো-এনার্জি বা কম তাপমাত্রার ডাইং প্রযুক্তি। প্রশ্ন উঠছে, এই প্রযুক্তি কি সত্যিই টেক্সটাইল শিল্পকে একটি টেকসই ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারে?

টেক্সটাইল উৎপাদনের ওয়েট প্রসেসিং ধাপ—যার মধ্যে ডাইং, ব্লিচিং ও ফিনিশিং অন্তর্ভুক্ত—শিল্পের সবচেয়ে বেশি শক্তি-নির্ভর অংশগুলোর একটি। প্রচলিত ডাইং প্রক্রিয়ায় সাধারণত ৮০ থেকে ২২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়, যা বজায় রাখতে প্রচুর বাষ্প ও জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি শিল্পের কার্বন নিঃসরণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, এই উচ্চ তাপমাত্রার নির্ভরতা কমানো গেলে শিল্পের জ্বালানি ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে লো-এনার্জি ডাইং প্রযুক্তি সামনে আসছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে। এই পদ্ধতিতে তুলনামূলকভাবে কম তাপমাত্রায়—অনেক ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই—ডাইং সম্পন্ন করা সম্ভব। এর ফলে একই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শক্তি সাশ্রয় হয়। শুধু জ্বালানি নয়, তাপ উৎপাদনের জন্য যে বয়লার ও স্টিম সিস্টেম ব্যবহৃত হয়, সেখানেও চাপ কমে আসে। এর অর্থ হলো, উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাবও হ্রাস করা সম্ভব।

গবেষণা অনুযায়ী, কম তাপমাত্রার ডাইং প্রযুক্তি কার্যকর করতে নতুন ধরনের ডাই, সহায়ক রাসায়নিক ও প্রক্রিয়াগত উন্নয়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে কিছু উন্নত রিঅ্যাকটিভ ডাই ও ক্যাটালিস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে ফাইবারের সঙ্গে রঙের সংযুক্তি কম তাপমাত্রাতেও সম্ভব হচ্ছে। ফলে কাপড়ের রঙের স্থায়িত্ব বজায় রেখেই শক্তি ব্যবহার কমানো যাচ্ছে।

শুধু শক্তি সাশ্রয়ই নয়, লো-এনার্জি ডাইং প্রযুক্তি পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ তাপমাত্রার ডাইং প্রক্রিয়ায় পানির ব্যবহার বেশি হয় এবং বর্জ্য পানিতে রাসায়নিকের ঘনত্বও বেশি থাকে। কম তাপমাত্রায় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিকের ব্যবহার কমে যায় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়। ফলে পানি দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ—দুটোই কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, অনেক কারখানার বিদ্যমান যন্ত্রপাতি উচ্চ তাপমাত্রার প্রক্রিয়ার জন্য তৈরি। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে গেলে কিছু ক্ষেত্রে মেশিন আপগ্রেড বা পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। দ্বিতীয়ত, নতুন ধরনের ডাই ও রাসায়নিকের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় প্রাথমিক বিনিয়োগ বাড়তে পারে। ফলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রযুক্তি গ্রহণে দ্বিধায় থাকে।

তবু বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতা শিল্পকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা এখন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেক ব্র্যান্ড ইতোমধ্যে সরবরাহকারীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশগত মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে শক্তি-দক্ষ প্রযুক্তি গ্রহণ করা শুধু পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশলও হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের মতো বড় পোশাক উৎপাদক দেশের জন্য এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের অধিকাংশ কারখানাই ওয়েট প্রসেসিংয়ের জন্য উচ্চ তাপমাত্রা-নির্ভর প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। যদি ধীরে ধীরে লো-এনার্জি ডাইং প্রযুক্তি গ্রহণ করা যায়, তাহলে তা একদিকে উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই উৎপাদনের দাবি পূরণ করতেও সহায়তা করতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, লো-এনার্জি ডাইং কোনো একক সমাধান নয়, তবে এটি টেক্সটাইল শিল্পের টেকসই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং নীতিগত সহায়তা একসঙ্গে কাজ করলে এই পদ্ধতি ভবিষ্যতের টেক্সটাইল উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তখন হয়তো প্রশ্নটি বদলে যাবে—লো-এনার্জি ডাইং শিল্পকে বাঁচাতে পারবে কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, এই প্রযুক্তি ছাড়া শিল্প কতদিন টিকে থাকতে পারবে।

About The Author

সম্পাদক
ইঞ্জি: আতিকুর রহমান আতিক
Email: Contact@textilemirrorbd.com