বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে ডেনিম খাত। কয়েক দশকের অগ্রযাত্রায় ছোট পরিসরের একটি উদ্যোগ থেকে আজ এটি পরিণত হয়েছে বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্পে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে অনেকেই “ডেনিম ডেস্টিনেশন” হিসেবেই চেনে।
এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। সে সময় ‘এনজেডএন ফ্যাশন’ নামের একটি ছোট কারখানা ইতালির এক ক্রেতার কাছে ১২ হাজার ডলারের জিন্স রপ্তানি করে। সেই ছোট রপ্তানি আজ বিশাল শিল্পে রূপ নিয়েছে, যা বাংলাদেশের পোশাক খাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে মূলত পাঁচ ধরনের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল—ট্রাউজার, টি-শার্ট, সোয়েটার, শার্ট ও অন্তর্বাস। তবে ডেনিম খাত সেই সীমা ভেঙে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে এই খাত উচ্চমূল্যের এবং ভ্যালু-অ্যাডেড পোশাক উৎপাদনের পথ খুলে দিয়েছে।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—এই দুই বড় বাজারেই ডেনিম সরবরাহে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি ২০২৩ সালে ছিল প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭১৩ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালে পৌঁছায় প্রায় ৯৫৬ মিলিয়ন ডলারে। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং বাজার অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী। সেখানে ২০২৩ সালে ডেনিম রপ্তানি ছিল প্রায় ১.২১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১.৩৬ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালে পৌঁছে যায় প্রায় ১.৬৪ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব প্রায় ৩০ শতাংশ।
এই দুই বাজার ছাড়াও জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা, ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ডেনিম পোশাক রপ্তানি হচ্ছে।
বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধি
ডেনিম খাতের দ্রুত বিকাশের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ। গত এক দশকে এই খাতে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে।
প্রায় দশ বছর আগে দেশে ডেনিম মিল ছিল মাত্র ১২টি, তখন বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় ৫০টি ডেনিম মিল চালু রয়েছে এবং মোট বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায়। এসব মিল মাসে প্রায় ৪ কোটি গজ ডেনিম কাপড় উৎপাদন করছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ডেনিম জনপ্রিয় হওয়ার বড় কারণ হলো প্রতিযোগিতামূলক দাম ও দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা।
বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ছে
ডেনিম পোশাকের আরামদায়ক ব্যবহার, দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং ক্যাজুয়াল ফ্যাশনের প্রসারের কারণে বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড যেমন এইচঅ্যান্ডএম, জারা, ইউনিক্লো, প্রাইমার্ক, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, গ্যাপ, ওয়ালমার্ট, রালফ লরেনসহ অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে ডেনিম পণ্য সংগ্রহ করছে।
দেশের ডেনিম মিলগুলো বর্তমানে স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ কাপড় সরবরাহ করছে। বাকি ৩০ শতাংশ কাপড় আমদানি করা হয় ভারত, চীন ও পাকিস্তান থেকে। তবে স্থানীয় কাপড় ব্যবহারে সময় ও খরচ দুটোই কম হওয়ায় অনেক রপ্তানিকারক এখন দেশীয় কাপড়কেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
চ্যালেঞ্জ: গ্যাস সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধি
খাতটির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে শিল্পটি। শিল্প মালিকদের মতে, গ্যাসের স্বল্পতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা। অনেক ডেনিম মিল বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। শিল্প খাতে গত কয়েক বছরে গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
ডেনিম উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ওয়াশিং, যেখানে উচ্চ গ্যাস চাপ প্রয়োজন হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
পরিবেশগত উদ্বেগ
ডেনিম উৎপাদনে পানির ব্যবহার নিয়ে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ রয়েছে। আগে এক কেজি ডেনিম কাপড় ধোয়ার জন্য ৩০০ থেকে ৩৫০ লিটার পানি লাগত। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে অনেক কারখানায় তা কমে ৩০ থেকে ৬০ লিটারে নেমে এসেছে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এটি ১৫ লিটার পর্যন্ত নামানো সম্ভব।
তবে পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, অনেক কারখানা বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন করলেও তা নিয়মিত চালু রাখা হয় না। ফলে দূষিত পানি নদী ও জমিতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাপী ডেনিম শিল্পের বাজারমূল্য ভবিষ্যতে প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই বাজারে আরও বড় অংশীদার হতে পারে।
সব মিলিয়ে, নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে ডেনিম উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান এখনও অটুট রয়েছে।
লেখকঃ বখতিয়ার নাসিফ আহাম্মেদ

