পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে আবারও বড় অর্জন দেখাল বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লিড (LEED) সনদপ্রাপ্ত বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কারখানার মধ্যে ৫২টিই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেকসই উৎপাদন, জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলেই এই অবস্থান অর্জন করেছে দেশ।
তৈরি পোশাক খাতে পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ গড়ে তোলায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে লিড (Leadership in Energy and Environmental Design–LEED) সনদপ্রাপ্ত কারখানার তালিকায় বিশ্বের সেরা ১০০টির মধ্যে ৫২টি বাংলাদেশের।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ২৮০টি লিড সনদপ্রাপ্ত সবুজ কারখানা রয়েছে, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ১১৮টি প্লাটিনাম এবং ১৪৩টি গোল্ড রেটিং অর্জন করেছে। এ অর্জন পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।গত বছরও এ ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে এক বছরে সর্বোচ্চ ৩৮টি কারখানা নতুন করে লিড সনদ পেয়ে সবুজ কারখানার তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
রবিবার (২৯ মার্চ) তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, আরও পাঁচটি পোশাক কারখানা নতুন করে লিড সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে তিনটি গোল্ড এবং দুটি প্লাটিনাম মান অর্জন করেছে।নতুন সনদপ্রাপ্ত কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের এপিক গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং কো. লিমিটেড (ইউনিট–৭), যা নতুন কারখানা নির্মাণ ক্যাটাগরিতে ৬৭ পয়েন্ট পেয়ে গোল্ড রেটিং অর্জন করেছে। ঢাকায় অবস্থিত সুরমা গার্মেন্টস লিমিটেড ৭১ পয়েন্ট পেয়ে গোল্ড রেটিং পেয়েছে। ধামরাইয়ের জয়পুরায় অবস্থিত নাফা অ্যাপারেলস লিমিটেড–ইউনিট ০২ ৬৫ পয়েন্ট পেয়ে গোল্ড মান অর্জন করেছে।
এছাড়া সাভারের কালমা ডেইরি ফার্ম এলাকায় অবস্থিত উইন্টার ড্রেস লিমিটেড ৮৫ পয়েন্ট পেয়ে প্লাটিনাম এবং চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত মেহের গার্মেন্টস লিমিটেড ৮৯ পয়েন্ট পেয়ে প্লাটিনাম মান অর্জন করেছে।
বিজিএমইএ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (USGBC) নির্ধারিত এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন বা লিড মানদণ্ডের ভিত্তিতে এসব সনদ দেওয়া হয়। জ্বালানি দক্ষতা, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সূচকে ভালো ফল করলেই কারখানাগুলো এ স্বীকৃতি পায়।শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবুজ কারখানায় উৎপাদিত পোশাকে ‘গ্রিন ট্যাগ’ যুক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। এতে বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের আস্থা বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে দরকষাকষির সুযোগও তৈরি হয়।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন কার্বন নিঃসরণ কমানো, জ্বালানি সাশ্রয় এবং টেকসই উৎপাদনের বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প সেই চাহিদার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবুজ কারখানার সংখ্যা বাড়ায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির প্রতিযোগিতা শক্তিশালী হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতেও এসব কারখানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সবুজ কারখানার সংখ্যায় বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে এবং বৈশ্বিক পোশাক শিল্পে টেকসই উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করবে।

